সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন যারা  » «   যুবলীগের পদ বেচে ঢাকায় ৪৬ ফ্ল্যাট-দোকানের মালিক ‘ক্যাশিয়ার আনিস’  » «   বরফ গলছে সৌদি-ইরানের, নেপথ্যে ইমরান খান  » «   ক্যাসিনো পঞ্চপাণ্ডবের রইল বাকি ১  » «   পুলিশের ওপর হামলা: দুই ‘জঙ্গি’ আটক  » «   সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কে চালকদের প্রতিযোগিতায় যাত্রীবাহী বাস খাদে, আহত ৭  » «   ইনস্টাগ্রামে ট্রাম্প-ওবামাকে পেছনে ফেললেন মোদি!  » «   একটি মোবাইল চার্জারের দাম ২২ হাজার টাকা  » «   বেতন বৈষম্য: কর্মবিরতিতে সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষক  » «   আবরার হত্যা: শেষ চার ঘণ্টার নৃশংসতার চিত্র  » «   সংবিধান পড়ে শোনালেন আমান, পুলিশ বলল ‘গো ব্যাক’  » «   বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা শুরু  » «   আবরার হত্যায় এবার মুজাহিদের স্বীকারোক্তি  » «   তিন সপ্তাহ ধরে কার্যালয়ে যান না যুবলীগ চেয়ারম্যান  » «   নোবেল পুরস্কার র‌্যাব-পুলিশের হাতে নয় : রিজভী  » «  

৯ মাসে ৩০% সফল সিলেট বাইকিং কমিউনিটি



জীবন পাল:: ট্রাফিক সচেতনতা বৃদ্ধি,হেলমেটে ব্যবহারে রাইডারদের আগ্রহ সৃষ্টি এবং সড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছে সিলেট বাইকিং কমিউনিটি। শুধু তাই নয়,এসবের পাশাপাশি অবসর সময়ে রাইডারদের নিয়ে ট্যুর ইভেন্ট আয়োজন করে যুব সমাজকে বিপথে যাওয়া থেকে দুরে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে এ বাইকিং কমিউনিটি। রাইডারদের নিয়ে পর্যটন এলাকাগুলোতে ট্যুরের মাধ্যমে সিলেট বিভাগকে পর্যটন এলাকা হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরাও যাদের কাজের আরেকটি অন্তর্ভক্ত বিষয় বলে জানা যায়।

২০১৮ সালের ৩০ শে অক্টোবর থেকে ৩-৪ জন বাইক রাইডার নিয়ে সিলেট বাইকিং কমিউনিটি’র কার্যক্রম শুরু। ’হেলমেট পড়–ন,জীবন বাঁচান’- এই স্লোগানকে সামনে রেখেই কার্যক্রম চলছে। ১০০ % বাইকারদের হেলমেটে পরা ও ট্রাফিক আইন-কানুন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা, উল্টা পথে গাড়ি না চালানো। এরকম মনমানসিকতা তৈরি করায় কমিউনিটি’র মূল লক্ষ।

সিলেট বাইকিং কমিউনিটি’র মতে- ট্যুরে গেলে আমাদের প্রথম শর্ত থাকে হেলমেট ও সেফটি গিয়ার পরে আসতে হবে। এর ফলে সচেতনতা বাড়ছে। আমাদের সাথে ট্যুর করতে আগ্রহী হলে আমরা বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে গিয়ে থাকি। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের মত অনেক জায়গায় আমরা ট্যুর দিয়ে সেই পর্যটন স্থানটিকে হাইলাইটস করার চেষ্টা করেছি,করে যাচ্ছি।

সিলেট বাইকিং কমিউনিটিতে বর্তমানে সিলেটসহ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার গ্রুপ মেম্বার রয়েছে। এক একটি ট্র্যুর আয়োজন করলে ১০০ এর কাছাকাছি বাইক রাইডার অংশগ্রহণ করে থাকে। তবে সব ট্যুরে ৫০ এর উপরে বাইক রাইডার অংশগ্রহণ করে থাকে। কিছুদিন আগে মৌলভীবাজার জেলার ৭ থানায় ট্যুর দিয়েছে বাইকিং কমিউনিটি। ৭টি থানার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে হেলমেট এর উপকারীতা ও ট্রাফিক নিয়ম মানা সম্পর্কে লিফলেট বিতরণ করে। তাছাড়া গ্রুপে এরকম সচেতনতামূলক পোষ্ট করেও সবাইকে সচেতন করা হয়ে থাকে ।

বাইকিং কমিউনিটি’র মতে- বর্তমানে আমরা ৩০ % সফল বলে মনে করছি। এর কারণ হিসেবে বলবো-আগে সিলেটের বাইকার হেলমেট পরতে ততটা অভ্যস্থ ছিলনা। অথচ বর্তমানের বাইকার হেলমেটে অভ্যস্থ হয়েছেন। আগে যেখানে কম দামের হেলমেট ব্যবহার করতো,এখন সেখানে ব্র্যান্ডের ভাল মানের হেলমেট ব্যবহার করছেন।দিলমলা,এমটি,এসএমকের মত রোড সার্টিফাইড হেলমেট সিলেটের বাইকাররা ব্যবহার করছেন। এ ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও আমাদের অবদান আছে। সেই সাথে ট্যুরে সবাই সেফটি গার্ড ব্যবহারে অভস্থ্য হয়েছে। যা আগে বাইকাররা ব্যবহার তো দুরের কথা অনেকে সেফটি গার্ডের সাথে পরিচিতই ছিলনা। সেই দিক থেকে বলবো সচেতনতা অনেকটাই বেড়েছে।

সিলেট বাইকিং কমিউনিটি’র সদস্যদের মন্তব্য- নিজের শহর থেকে বাইরে বের হলে এখন প্রায় বাইকার সেফটি গার্ড ব্যবহার করছেন। যুব সমাজের মধ্যে অলস মনমানসিকতা থাকলে যেমন নোংরা চিন্তাভাবনা মনের মধ্যে বাসা বাধে সেটা এখন আর নেই। ট্যুর আয়োজন করলে যুব সমাজের বাইকাররা অবসর সময়টা অলস ভাবে না কাটিয়ে বিনোদনের অংশীদার হতে ট্যুরে চলে আসে।যুব সমাজ যখন প্রকৃতিকে ভালবাসবে,ট্যুর দিতে ভালবাসবে তখন মাদকের মত জীবন ধ্বংসকারী নেশাগুলো তাকে আর আকৃষ্ট করতে পারবেনা। আর একজন মানুষ যখন একটা শৃ্খংলার আয়তায় চলে আসেন তখন সে অপরাধমূলক কাজে জড়াতে তেমন একটা সুযোগ পাইনা কিংবা জড়াতে চাইনা। আমাদের বাইকাররাও কমিউনিটিতে যোগদানের পর এই শৃ্খংলার মধ্যে চলে আসে।

সিলেটের বাইকারদের এই প্ল্যাটফর্মকে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগের বাইক রাইডার ফলো করছে বলে জানা যায়। সচেতনতামূলক থিমগুলো ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে দেওয়াটাই হচ্ছে বাইকিং কমিউনিটি’র মূল পরিকল্পনা। কোন লাভের চিন্তাভাবনা থেকে নয়,নিজেদের পকেটের টাকায় তেল ভরে ট্যুর দেওয়া,প্রকৃৃতি দেখা, কমিউনিটির রাইডার সচেতনতা দেখে অন্য রাইডাররা সচেতন হবে এটাই তাদের প্রত্যাশা। বাইকিং কমিউনিটি’র সদস্যরা মনে করেন- অন্য বাইকাররা যখন দেখবে এ কমিউনিটির বাইকাররা সেফটি গার্ড,হেলমেট,ভাল শো এবং গ্লাপস পরে বাইক রাইড করছে তখন অন্য বাইক রাইডারদের ভিতরেও বাইক রাইড করার সময় এরকম প্রস্তুতি ন্ওেয়ার আগ্রহ জন্মাবে। কমিউনিটির বাইকারদের দেখে অন্য বাইকার অনুপ্রাণিত হবে।

কথা বলে জানা যায়- প্রতি সপ্তাহে সিলেট বিভাগের মধ্যে সিলেট বাইকিং কমিউনিটি’র ট্যুর থাকে। তবে বড় কোন ট্যুর থাকলে সিলেট বিভাগের বাইরে যাওয়া হয়। যেমন-ফেব্রুয়ারীতে চট্টগ্রাম ট্যুরের আয়োজন করা হয়েছিল। যে ট্যুরে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বান্দরবন,খাগড়াছড়ি,সাজেক,রাঙ্গামাটি, দিনপাহার, আলিকদম,কক্সবাজার।

আগামী ঈদুল আযহার পরে আরেকটি বড় ট্যুর এর আযোজন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিলেট বাইকিং কমিউনিটি’র সদস্য সায়েদ জামান। ট্যুরের নিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে সায়েদ জামান জানান- বড় ট্যুরে ২৫ জনের মত বাইকারের অংশগ্রহণে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। ছোট ছোট ইভেন্ট থেকে বড় ট্যুরের জন্য বাইকার সিলেক্ট করা হয়। ছোট ট্যুরের মাধ্যমে যেসব বাইকারের স্কীল বেড়েছে,যারা বড় ট্যুর দিতে পারবে বলে মনে হয় তাদেরকে চ’ড়ান্তভাবে বাছাই করা হয়। তবে ট্যুরে যেতে হলে অবশ্যই প্রত্যেক রাইডারকে তার ফ্যামিলির অনুমতি নিয়ে আসতে হয়। সেজন্য আমরা বাইক রাইডারদের ভোটার আইডি থেকে পরিবারের মানুষদের সাথে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে থাকি। একজন রাইডার যে তার নিজের দায়বদ্ধতা থেকে ট্যুরে যাচ্ছে এবং আমাদের গ্রুপের সাথে একসাথে যাচ্ছে তা রাইডারের ফ্যামিলিকে অবগত করা হয়ে থাকে।

তিনি জানান- গ্রুপ নিয়ে আমদের পরিকল্পনা হলো সবার ভিতরে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা।সমাজকে একটা ম্যাসেজ দেওয়া যে অপ্রাপ্ত সন্তানদের হাতে যেন কোন অভিভাবক মটরসাইকেল তুলে না দেন। জীবনকে যেন ঝুকির মধ্যে না ফেলে দেন।

কমিউনিটির সদস্য হওয়ার আগ্রহের পেছনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিলেট বাইকিং কমিউনিটির সদস্য-মো.সোলাইমান পাটুয়ারী জানান- সিলেট বাইকিং কমিউনিটির নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং সেইফ রাইড পরিচালনা দেখে ৫ মাস আগে সদস্য হয়েছি। সেই সাথে মোটরসাইকেল রাইড বিষয়ে অনেক কিছু জানার আগ্রহ থেকেই সিলেট বাইকিং কমিউনিটিতে প্রবেশ।

কমিউনিটির এই সদস্য আরো জানান- স্পীড আছে দেখেই বাড়াতে হবে,এমন তো কথা নয়। সবার আগে আমাদের নিজেদের সেইফটা নিজেদের মাথায় রাখতে হবে। সেটা এই কমিউনিটির মাধ্যমে শিখতে পেরেছি,জানতে পেরেছি। তাছাড়া কমিউনিটির মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলো দেখতে পারছি। বিভিন্নি এলাকার কালচার সম্পর্কে জানতে পারছি। এই কমিউনিটির সাথে না থাকলে যা আমার জন্য কোনদিনও সম্ভব হত না। কাজের ক্ষতি না করার জন্য শুক্রবার বেছে নেওয়া হয়েছে,যা আমাদের জন্য অবসরের দিন হিসেবে বলা যেতে পারে। আর আগ্রহটা যাকে ঘিরে তিনি হচ্ছেন একজন বাইক রাইডার । এই গ্রুপের অ্যাডমিন-নাহিদ তালুকদার। যিনি একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রাইডার। তার দক্ষতা,সচেতনতা,নিয়ম-শৃঙ্খলা দেখেই আমি অনুপ্রাণিত হয়।

অ্যাডমিনদের মতে- আমরা তো অনেকে বাইকার ট্যুর দেই। কিন্তু কেউ কাউকে চিনি না। সবাইকে যদি একটা গ্রুপের মাধ্যমে যুক্ত করা যায় তাহলে আমরা আর কেউ কারো অপরিচিত থাকবো না। সবাই সবার পরিচিত হয়ে যাবো। সেই ভাবনা থেকেই গ্রুপের মূল শুরু। সিলেট থেকে শুরু।

কমিউনিটি’র আরেক সদস্য নাহিদ তালুকদার জানান- সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাটা ঘটছে অহরহ । তবে ট্যুরে গিয়ে দুর্ঘটনার মত ঘটনা কিন্তু খুব বেশি শোনা যায় না। এর কারণ হল ট’্যরে যাওয়া মোটর সাইকেল চালকরা,মানে আমাদের রাইডাররা সাধারন মোটর সাইকেল চালক থেকে অনেক বেশি সচেতনতা অবলম্বন করে। ট্রাফিক আইন মেনে মোটর সাইকেল চালান। ট্রাফিকের সকল নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলেন। যার ফলে দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হয়। আর আমাদের এই সচেতনতাটাকে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াটাই আমাদের কমিউনিটির প্রধান কাজ। আমরা চাই সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে, সাধারন মানুষদের সচেতন করে ট্রাফিক নিয়ম ফলো করার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সাল মাহমুদ বলেন- সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শুধু সিলেট বাইকিং কমিউনিটি কেন,সকল মানুষকে স্বত:ফুর্তভাবে ট্রাফিক নিয়ম শৃঙ্খলা পালনে ও সচেতনা বৃদ্ধিতে কাজ করা উচিত। কেননা,সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা ছাড়া সমাজে কোন ভাল কাজ করা সম্ভব হয়না। নিরাপদ সড়ক,ট্রাফিক সচেতনতা এটা শুধু ট্রাফিক পুলিশের একার কাজ নয়। সড়কের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সকলকে একত্রে কাজ করা উচিত।

সিলেট বাইকিং কমিনিটি সম্পর্কে তিনি বলেন- তারা (সিলেট বাইকিং কমিউনিটি) ট্রাফিক পুলিশের সম্মানে রমজানে ইফতারের আয়োজন করেছিল,সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জেনে এবং তাদেও সাথে কথা বলে আমার অনেক ভাল লেগেছে। এই কমিউনিটির এরকম কার্যক্রমকে আমি মন থেকে সাপোর্ট করি। কেননা,তারা প্রথমে নিজেরা সচেতন হয়েছে,ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলছে। তারপর নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে সড়ক নিরাপদ করতে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। মানুষকে সচেতন করছে। এটা নি:সন্দেহে একটি ভাল কাজ। তাদের জন্য আমার শুভ কামনা।আর এরকম ভাল কাজে আমাদেরকে প্রত্যেককে এগিয়ে আসা উচিত। সহযোগিতার জন্য আর কিছু না পারলেও অন্ততপক্ষে সাপোর্ট করা উচিত। যাতে করে ভাল কাজের প্রতি তাদের আগ্রহটা আরো বাড়ে। এরকম ভাল কাজ করতে উৎসাহ পাই ।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: