বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
মিয়ানমার তাদের লোকদের ফেরত নিতে রাজি হয়েছে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী  » «   রাজশাহীতে মা-ছেলে হত্যায় আ.লীগ নেতাসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড  » «   অবশেষে সেই বাংলাদেশি যুবকের লাশ ফেরত দিল বিএসএফ  » «   নিউইয়র্কে হবে শেখ হাসিনা-বিল গেটস বৈঠক  » «   ‘এবার এক দেশ, এক দলের’ ইঙ্গিত বিজেপি সভাপতির  » «   রাতে আটক, ভোরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত  » «   জগন্নাথপুরে র‌্যাবের জালে আটকা পড়লেন ভূয়া ডাক্তার  » «   এবার ভিসি ফারজানার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ  » «   রংপুর-৩ উপনির্বাচন: লাঙ্গলের ঘাঁটিতে আসিফের দিকেই ভোটের হাওয়া  » «   রিফাত হত্যা: যা বললেন সেই রিকশাচালক  » «   চতুর্থ ড্রিমলাইনার ‘রাজহংস’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী  » «   সুনামগঞ্জে অজ্ঞাতনামা যুবকের মরদেহ উদ্ধার  » «   বন্দরবাজার থেকে ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী আটক  » «   আফগান প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা, নিহত ২৪  » «   বিভাগীয় শহরে হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র  » «  

সেদিন কী ঘটেছিল কুষ্টিয়া আদালত চত্বরে



কাফি কামাল: গত রোববার কুষ্টিয়া আদালত চত্বরে হামলার শিকার হন দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার মুখে ও মাথায় আটটি সেলাই পড়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেদিন কী ঘটেছিল কুষ্টিয়ায়। মাহমুদুর রহমানের সঙ্গী ছিলেন বিএফইউজে (একাংশ) মহাসচিব এম আবদুল্লাহ।

তাকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী ঘটেছিল সেদিন? তার বর্ণনায়, যশোর বিমানবন্দর থেকে মাইক্রোতে চড়ে আমরা যখন কুষ্টিয়া আদালতে পৌঁছাই তখন বেলা ১১টা ৫ মিনিট। আদালত প্রাঙ্গণের পরিবেশ তখনও ছিল দৃশ্যত স্বাভাবিক, শান্তিপূর্ণ। আদালতে পৌঁছেই আইনজীবীর চেম্বারে যান মাহমুদুর রহমান। সেখানে তিনি তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মানহানি মামলায় ওকালতনামায় সই করেন। সেখানে উপস্থিত হন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে তিনি আইনজীবীর চেম্বার থেকে বেরিয়ে বিচারকের এজলাসের দিকে হাঁটা শুরু করেন।

এ সময় স্থানীয় এক সাংবাদিক এসে তাকে জানায়, ‘পরিস্থিতি ভালো নয়। আদালতের বারান্দা ও গেটে অবস্থান নিয়েছেন ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকরা।’ সেটা শুনেও মাহমুদুর রহমান স্বাভাবিকভাবেই বিচারকের এজলাসের দিকে এগিয়ে যান। তিনি যখন এজলাসের দিকে যাচ্ছিলেন তখন ছাত্রলীগের কর্মীরা অভ্যর্থনা দেয়ার মতো করে আদালতের বারান্দার দুই পাশে দাঁড়িয়ে পড়েন। মাঝখান দিয়ে ৪০-৫০ মিটারের মতো বারান্দাটি পেরিয়ে যাবার সময় তাদেরই কেউ কেউ মাহমুদুর রহমানকে ইশারায় দেখিয়ে দিয়ে বলেন- ‘এই যে, এই এই’। তিনি যখন কুষ্টিয়া সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এমএম মোরশেদের আদালতে যান তখনও ম্যাজিস্ট্রেট এজলাসে বসেননি। সাড়ে ১১টার দিকে ম্যাজিস্ট্রেট এজলাসে বসেন।
নিম্ন-আদালতের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে জিআর মামলার শুনানি শুরু হয়। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের আইনজীবীর অনুরোধে আদালত প্রথমেই তার মামলাটির শুনানি শুরু করেন। এ সময় স্বপ্রণোদিতভাবেই কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান মাহমুদুর রহমান। শুনানিতে সরকারি পিপি জামিনের বিরোধিতা করেন। শুনানি শেষে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, অন্য মামলার শুনানি শেষে এ মামলার আদেশ দেয়া হবে। তিনি অপেক্ষা করতে বলে অন্য মামলার শুনানি শুরু করেন। এভাবে কেটে যায় বেশকিছু সময়। বেলা ১টার দিকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ইন্সপেক্টরকে ডেকে আনেন। ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত বারান্দা থেকে ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকদের সরিয়ে দেয়ার আদেশ দেন। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট এ মামলায় মাহমুদুর রহমানকে স্থায়ী জামিন দেন। সেই সঙ্গে কোর্ট ইন্সপেক্টরকে বলেন যেন মাহমুদুর রহমানকে নিরাপদে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।

জামিনের আদেশ পাওয়ার পর মাহমুদুর রহমানকে বহনকারী গাড়িটি মূল গেটে নেয়ার জন্য চালককে ফোন করলে তিনি জানান, ছাত্রলীগের কর্মীরা গাড়িটি দখল করে চাবি নিয়ে গেছে। এ সময় মূল গেটে ছাত্রলীগকর্মীদের অবস্থান দেখে কোর্ট ইন্সপেক্টর মাহমুদুর রহমানকে আরেকটি পথে হাঁটিয়ে জজ কোর্টের দিকে নিয়ে যান। তিনি জানান, জটলার দিকে না গিয়ে ওই পথেই আমাদের নিরাপদে বের করে দেবেন। মাহমুদুর রহমান জজ কোর্টের গেটের দিকে যাচ্ছে দেখে ছাত্রলীগের ছেলেরা দৌড়ে সে গেটের দিকে যায়। সে গেটে অবস্থান নিয়ে তারা আক্রমণাত্মক স্লোগান দেয়। ছাত্রলীগের কর্মীরা গেট দিয়ে ঢুকে হামলা করতে এগিয়ে এলে সাংবাদিক, আইনজীবী ও কোর্ট পুলিশ কলাপসিবল গেটটি আটকে দেয়।

এ অবস্থায় ভেতরে আধাঘণ্টার মতো আটকে থাকেন মাহমুদুর রহমান ও তার সঙ্গীরা। এম আবদুল্লাহ বলেন, প্রথমবার গেটে গিয়ে বাধার মুখে পড়ার পর একজন আইনজীবীর কাছ থেকে নাম্বার যোগাড় করে আমি কুষ্টিয়ার এসপি মেহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। নিজের পরিচয় দিয়ে তার কাছে নিরাপত্তা চাই। জবাবে মেহেদী বলেন, ‘আমি ঢাকা আছি কিছু করতে পারব না। এডিশনাল এসপিকে ফোন দেন।’ পরে এডিশনাল এসপিকে ফোন দিলে তিনি বলেন, ‘সেখানে সদর থানার ওসি আছেন, তিনি দেখছেন; আমি তাকে বলেছি।’

আধাঘণ্টা পর আইনজীবীরা মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে ফের ম্যাজিস্ট্রেট এমএম মোরশেদের এজলাসে যান। তখন তার আদালতে একটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছিল। আইনজীবীরা তাকে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা মাহমুদুর রহমানকে বহনকারী গাড়ি দখল করে রেখেছে। নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তাই তার নিরাপত্তা চান। আইনজীবীদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘আমি দেখছি।’ তিনি কোর্ট ইন্সপেক্টরকে সদর থানার ওসিকে আসতে বলেন। কোর্ট ইন্সপেক্টর মোবাইলে যোগাযোগ করলেও সদর থানার ওসি আসেননি। উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকদের পরামর্শে আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। হানিফ তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমি শুনেছি, দেখছি।’ কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও কোনো অ্যাকশন দেখা যায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে এবং পুরো পরিস্থিতি বর্ণনা করে ফেসবুক লাইভে যান মাহমুদুর রহমান।
বিকাল ৩টার দিকে ম্যাজিস্ট্রেট এজলাস থেকে নেমে যান। মাহমুদুর রহমান ও তার সঙ্গীদের এজলাসেই অপেক্ষা করতে বলেন। ম্যাজিস্ট্রেটের পেশকার জানান, ‘স্যার র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারা এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন।’

কিছুক্ষণ পর জানা যায়, র‌্যাব জবাবে জানিয়েছে বিষয়টি পুলিশের এসপি মেহেদী দেখছেন। সময় গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা তখন বিকাল ৪টার ঘরে, ততক্ষণে আদালতের গেটে একটি প্রাইভেটকার যোগাড় করা হয়। হঠাৎ করেই পাল্টে যায় সবকিছু। এই অবস্থার মধ্যেই মাহমুদুর রহমানকে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগের পরামর্শ দেয়া হয়। কোর্ট ইন্সপেক্টর তাদের প্রাইভেট কারটি তুলে দেন। পরক্ষণই হামলাকারীরা সামনের ও পেছনের গ্লাস দুটি ভেঙে ফেলে। তখনও মাহমুদুর রহমান ছিলেন সম্পূর্ণ অক্ষত।

এ সময় কয়েকজন আইনজীবী ও সাংবাদিক দুই পাশে কর্ডন করে গাড়িটি এগিয়ে দেয়। পরক্ষণেই শুরু হয়ে যায় ইটবৃষ্টি। গাড়ি আদালত চত্বর পেরিয়ে সামনে মোড়ে পৌঁছালেই মূল আক্রমণটি হয়। একটি ছেলে চিৎকার করে ছাত্রলীগের ছেলেদের ডাক দেয়। ‘কই তোরা, ওই তো… (অশ্রাব্য গালি) চলে যাচ্ছে’। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রাস্তার দুই পাশ থেকে লাঠি হাতে বেরিয়ে আসে বেশ কয়েকজন ছেলে। পাশের গ্লাস ভাঙা থাকায় তারা এবার সরাসরি গাড়ির ভেতরে মাহমুদুর রহমানকে আঘাত করতে থাকে। গাড়ির ভেতরে তার দুই পাশে থাকা অ্যাডভোকেট লিয়ন ও ইঞ্জিনিয়ার রিজু তাকে রক্ষার চেষ্টা করলেও তারা লাঠি দিয়ে গুঁতিয়ে ও আঘাত করে রক্তাক্ত করে।

তৃতীয় দফা হামলার সময়ই মারাত্মক আহত হন মাহমুদুর রহমান। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে তার সঙ্গী ও স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক ফের আদালত ভবনের একটি আইনজীবী চেম্বারে গিয়ে আশ্রয় নেন। চেম্বারটি ছিল কুষ্টিয়া মহিলা আইনজীবী সমিতির অ্যাডভোকেট সামস তামিম মুক্তির। পরক্ষণেই সে চেম্বারে হামলা করে ছাত্রলীগ। এক পশলা বৃষ্টি নামলে আক্রমণকারীরা চলে যায়। তার মিনিট পাঁচেক পর সেখানে আসেন কুষ্টিয়া সদর থানার ওসি নাসির। তিনি চেম্বারের বাইরে থেকে নক করে বলতে থাকেন, ‘আপনারা বেরিয়ে আসেন। আমি আপনাদের এগিয়ে দেব।’ এ সময় মাহমুদুর রহমান ও তার সঙ্গীরা আইনজীবীর চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসেন।

পরে কুষ্টিয়ার এক সাংবাদিক একটি অ্যাম্বুলেন্স যোগাড় করেন। সে অ্যাম্বুলেন্সে করে মাহমুদুর রহমান ও তার সঙ্গীরা যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ওসি নাসিরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম তাদের কুষ্টিয়া জেলার সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। পথে গাড়িটির গ্যাস ফুরিয়ে গেলে ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে থেকে আরেকটি মাইক্রোবাস যোগাড় করে তারা যশোর বিমানবন্দরে পৌঁছেন। সেখানে একজন চিকিৎসক মাহমুদুর রহমানের মাথা, ঘাড় ও মুখে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ করে দেন। সেখানে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনা তুলে ধরে তিনি বিমানের ফ্লাইট ধরেন। দুপুরে কুষ্টিয়ায় স্থানীয় সাংবাদিকরা একটি রেস্টুরেন্টে মাহমুদুর রহমান ও তার সঙ্গীদের জন্য খাবার অর্ডার করলেও পরে রেস্টুরেন্ট মালিক সে অর্ডার বাতিল করেন।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: