বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
পেটে গজ রেখে সেলাই: ক্ষতিগ্রস্ত মাকসুদা ৯ লাখ টাকা পাবেন  » «   হোটেলের খাবার খেয়ে অসুস্থ ৩০ শিক্ষার্থী  » «   মাটির নিচে মাইন শনাক্ত করবে বাংলাদেশের রোবট  » «   জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণার আহ্বান তুরস্কের  » «   ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীকে দেখতে গেলেন ডেপুটি স্পিকার  » «   বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ  » «   টয়লেটে গোপনে নগ্ন ছবি তুলে ব্লাকমেইল, আত্মহত্যার চেষ্টা  » «   ও আইসি সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি‘মুসলিম দেশগুলোর নিশ্চুপ থাকার সুযোগ নেই’  » «   পত্নীতলায় বিজয় দিবস আন্ত:ইউনিয়ন ভলিবল টুর্ণামেন্টের উদ্বোধন  » «   পত্নীতলার প্রিয় মুখ বিএফডিসি, এর তরুন কমেডিয়ান ইমরান হাসোর আজ জন্মদিন  » «   পত্নীতলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত  » «   রাজশাহীতে ৩ সাংবাদিককে পেটাল ছাত্রলীগ  » «   খালেদার দুর্নীতি নিয়ে ইনুর ওপেন চ্যালেঞ্জ  » «   ফেসবুকে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে নগ্ন ভিডিও-ছবি  » «   অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি ১২৮ কর্মকর্তার  » «  

সিলেট শহর জুড়ে লটারির ফাঁদ : ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার নামে লটারি-জুয়া!



হাসান মো শামীম ::বর্তমানে লটারি জ্বরে পুড়ছে সিলেট শহর । লাক্কাতুরাস্থ খেলার মাঠে তৃনমল নারীদের ব্যানারে আয়োজিত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলা যার মুল নিয়ামক। প্রতিদিনই হচ্ছে ড্র,সরাসরি দেখানো হচ্ছে এসসিএসে, থাকছে মুল্যবান সব পুরষ্কার। অথচ মেলা আয়োজনের অনুমতি পত্রে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ছিল মেলার নামে হাউজিং বা লটারি করা যাবেনা। প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা দিলেও ভিন্ন এক অনুমতি পত্রের ধুয়া তুলে লটারি হালাল করার চেষ্টায় রত মেলার প্রধান আয়োজক বাবলু। মেলা আয়োজক তৃনমুল নারী ঊদ্যোক্তা সোসাইটী গ্রাসরুট এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মারিয়ান চৌধুরী মাম্মীর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলের চিকিৎসা ব্যয় তুলার জন্যই করা হয়েছে লটারির আয়োজন ,এমন টাই জানালেন তিনি।এ ব্যাপারে প্রশাসন বরাবর স্মারক লিপি দেওয়ার দাবি বললেও ‘কনফিডেনশীয়াল’ বলে তা দেখাতে রাজি হননি তিনি । মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে স্থানীয় নেতৃবৃন্দও নাকি একমত হয়ে ছিলেন লটারির ব্যাপারে! তার দাবি সামাজিক অবক্ষয় নয়,বরং লটারির পুরস্কারের মাধ্যমে আর্থিক ভাবে সাবলম্বি হচ্ছে গরীব মানুষ । এ ব্যাপারে বাবুলের সাথে আলাপ করলে ভাল বলে কোন কথা বলতে রাজি হননি বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মারিয়ান মাম্মি, তবে ছেলের অসুস্থতার কথা স্বীকার করেন তিনি। জানান এ ব্যাপারে গ্রাসরূট কেন্দ্রীয় কমিটিও অবগত আছেন ।
নব্বই দশকে ১০ টাকার লটারিতে ছিল চল্লিশ লক্ষ টাকা জয়ের সুযোগ। তবে আর্তমানবতার সেবায় লটারির সেই ধারনা পরিবর্তিত হয়ে অনেকটা জূয়া আদলেই চলছে সিলেট শহরে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার নাম ব্যবহার করে অভিনব কায়দায় চলছে লটারি নামক জুয়া। প্রতিদিনই হচ্ছে র‌্যাফেল ড্র। সারাদিন লটারি বিক্রি করে রাতে সরাসরি এর ড্র দেখানো হচ্ছে সিলেট ক্যাবল সিস্টেম (এসিএস) চ্যানেলে। অথচ মেলার অনুমোদনের সময় দেওয়া প্রশাসনের অনুমতিতে স্পষ্ট নিষেধ করে লেখা আছে মেলার নামে লটারি বা জুয়া খেলা যাবেনা। কিন্তু প্রসাশনের অনুমতি উপেক্ষা করে প্রসাশনের নাকের ডগায় বসেই চলছে এই লটারি জুয়া । আশ্চর্য হলেও সত্য ,নগদ টাকা নয় গাড়ি, মোটর বাইক, কম্পিউটার এমনকি গরু পর্যন্ত আছে পুরষ্কারের তালিকায়।
এ ব্যাপারে বাবলু ডেইলি সিলেটকে বলেন ‘মেলায় কোন প্রবেশ টিকিট নেই, তাছাড়া এর আয়োজন হচ্ছে শহরের শেষ সীমানায়। দর্শনার্থীদের আশানুরুপ উপস্থিতি না হলে মেলা ক্ষতির সম্মুখিন হবে। সে কারনেই মুলত লটারির আয়োজন করা।’ এ ছাড়া মারিয়ান মাম্মির ছোট ছেলের দুটি কিডণি ড্যামেজ হওয়ায় লটারি থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি বড় অংশ তার চিকিৎসা খাতে ব্যয় করা হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন- ‘মূলত বাগান পঞ্চায়েত কমিটির মসজিদ, মন্দির, উপসনালয় এর উন্নতির জন্য লাক্কাতুরাস্থ এই মাঠটি মেলার জন্য পাঁচ লাখ টাকার চূক্তিতে এক মাসের জন্য নেওয়া হয়েছিল। এই টাকা পাওয়ার ফলে অবহেলিত চা শ্রমিকে দের জীবন মান উন্নয়ন হচ্ছে! মেলার লটারি থেকে বিয়ানীবাজারের একজন রিকশাচালক মোটর সাইকেল জিতেছেন জানিয়ে তিনি বলেন- ‘সেই রিকশাচালক সাথে সাথে মোটর সাইকেল টি বিক্রি করে তিনটি রিকশা কিনেছেন যাতে করে তার ভাগ্য উন্নয়ন হয়েছে! এসসিএসে সরাসরি ড্র দেখানোর যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্যই সরাসরি সম্প্রচার,তাছাড়া রাতের ওই সময়ে অনেকের পক্ষেই মেলা মাঠে আসা ^সম্ভবপর হয়না তাই এমন আয়োজন।
অথচ বাস্তব পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। জানা গেছে তীর শিলংয়ের ব্যাপারে প্রশাসনের ব্যাপক কড়াকড়ি থাকায় সিলেটের জুয়াড়ীরা এখন ট্রেন্ড বদল করে ফেলেছেন। ভোল বদল করে তারা এখন ভিড় করছেন প্রতিদিনের লটারিতে। উদ্দ্যেশ্য আলোচনায় আসার আগেই এর থেকে বিপুল অর্থ কামিয়ে নেয়া। অনেক কর্মক্ষম মানুষ লটারির উপর ভর করে ছেড়ে দিচ্ছেন রোজকার কাজ কর্ম। বেশি সংখ্যক লটারির টিকিট কিনে আশায় থাকেন পুরস্কার জয়ের। রাত হলেই দেখা যায় টিভি সেটের সামনে ভীড়। অনেক সময় পুরস্কার না জেতার হতাশায় হচ্ছে হাঙ্গামা। ফলে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়।
আমাদের কাছে আসা এসএমপি পুলিশ নগর বিশেষ শাখার একটি স্মারক লিপি ঘেটে দেখা যায়, গত ২৮ জুলাই লাক্ষাতুরা চা বাগান এলাকায় একটি মেলার অনুমতি দেওয়া হয়। এতে তৃনমুল নারী ঊদ্যোক্তা সোসাইটী (গ্রাসরুটস) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি শাহনাজ বেগম কে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলা করার জন্য মাসব্যাপি অনুমতি দেয় পুলিশ প্রশাসন।স্মারক লিপিতে প্রশাসনের দেওয়া ১৫ টি শর্তের মধ্যে ৬ নমব শর্তে উল্লেখ করা হয় ‘ মেলায় কোন প্রকার জুয়া খেলা/র‌্যাফেল ড্র বা জুয়া খেলা বলিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে প্রচলিত , এমন সব নিষিদ্ধ প্রচার/কর্ম বিরত থাকা”। সেই শর্তে মেলার অনুমতি নিয়ে প্রথম দিন থেকেই চালু করা হয় র‌্যাফেল ড্রয়ের ! অর্থ্যা প্রশাসনের আইন কে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে চলে লটারি জুয়া। ব্যাপারটি এমন যেন শুধু লটারি ড্র করার জন্যই মেলা চালু করা হয়।
২০ টাকার লটারি! আর তাতেই থাকছে গাড়ি, মোটরসাইকেল, আস্তো গরু, ফ্রিজ, টিভি, মোবাইলসহ অর্ধশত পুরষ্কার। শুধু একদিন নয় এ লটারি চলবে মাস ব্যাপি। ”যদি লাইগা যায়” এ মনোভাব থেকে সাধারণ ও নিন্ম আয়ের মানুষ হুমড়ি খেয়ে এসব লটারি ক্রয় করছেন। আর এতেই ভাগ্য যাচাইয়ের নামে আয়ের বেশীর ভাগ অংশ বিলিয়ে দিচ্ছেন। সিলেট সদর উপজেলার লাক্কাতুরা এলাকার জনসাধারণ চা-শ্রমিকদের সংখ্যায় বেশী । এই নিন্ম আয়ের জনবসতির পাশেই এ ধরণের লাকি কূপন র‌্যাফেল ড্র আয়োজন করায় ভাগ্য যাচাই করতে গিয়ে নিস্ব হচ্ছেন বাসিন্দারা।
জানা গেছে, প্রতিদিন এসব বাম্পার পুরষ্কারের লোভ দেখিয়ে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিক্রি করা হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ লটারি কূপন। শুধু মেলা প্রাঙ্গনে নয় এসব লটারি রিকশায় করে বিক্রি করা হচ্ছে সিলেটের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও প্রধান সড়ক গুলোতে। নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে লাকি কূপন বুথ। এছাড়াও প্রায় দুই শতাধিক রিকশা ও অটোরিকশা সিএনজিতে মাইক বেঁধে লটারি কূপন নিয়ে ছুটছে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলাতেও। আর তা থেকে আয় হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। রাত ১০টায় স্থানীয় ক্যাবল অপারেটর এসসিএস এর মাধ্যমে সরাসরি প্রচার করা হচ্ছে এ র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠান।
মেলা পরিচালনা কর্তৃপক্ষ এই লটারি কিংবা র‌্যাফেল ড্র প্রশাসনের যথাযথ অনুমতি নিয়ে পরিচালনা করছে দাবী করলেও প্রশাসন বলছে মেলায় কোন প্রকার জুয়া খেলা/ র‌্যাফেল ড্র বা যা জুয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিচালনা নিষিদ্ধ। প্রশাসনের অনুমতি পত্রে স্পষ্ট ভাবে র‌্যাফেল ড্র বা জুয়া হিসেবে গণ্য এসব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলেও ‘দৈনিক প্রভাত সুরমা’ র‌্যাফেল ড্র নামের এ বাণিজ্য ক্ষমতাসীন দলের বেশ নেতার ছত্রছায়ায় প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব লটারি কূপন নিয়ন্ত্রন করছেন এম এম মোনায়েম খাঁন বাবলু । এ মেলায় তিনি পরিচালনা পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, সিলেট মহানগর এলাকায় কোন মেলার আয়োজন করতে হলে পুলিশ কমিশনার এর অনুমোদন দেয়। মেলায় র‌্যাফেল ড্র চলবে কিনা সেটাও যারা অনুমোদিন দিবেন তাঁরা দেখবেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা জানান, মেলার অনুমোদন দিয়েছে নগর বিশেষ শাখা (এসবি) কর্তৃপক্ষ। তিনি নগর বিশেষ শাখার প্রতিনিধির সাথে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের নগর বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম বলেন, মেলার অনুমতি পত্রে স্পষ্ট লেখা রয়েছে কোন প্রকার জুয়া খেলা/ র‌্যাফেল ড্র আয়োজন নিষিদ্ধ। তাহলে কিভাবে এ র‌্যাফেল ড্র আয়োজন করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি, সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মতর্তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সোসাইটির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মারিয়ানা চৌধুরী মাম্মি জানান, মেলায় লোক সমাগমের জন্যই এ র‌্যাফেল ড্র এর আয়োজন করা হয়েছে। প্রশাসনের যথাযথ অনুমোদন নিয়েই র‌্যাফেল ড্র পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ড্র অনুষ্ঠান সরাসরি ক্যাবল অপারেটর সার্ভিসের মাধ্যমে টিভিতে প্রচার করা হচ্ছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া অনুমতি পত্রে কোন র‌্যাফেল ড্র আয়োজনের নিষিদ্ধ উল্লেখ করা হয়েছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, প্রশাসন আসলে অবৈধ জুয়া কিংবা র‌্যাফেল ড্র বলতে তীর খেলাকে বুঝাতে চেয়েছেন। আমারা তীর খেলার আয়োজন করছি না।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: