রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী‘আসল প্রশ্নফাঁসকারী তো শিক্ষক’  » «   আগামী ২০ ডিসেম্বর তৈমুরের জন্মদিন : চলছে রাজকীয় আয়োজন  » «   কার চাপায় যুবক নিহত  » «   বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু  » «   ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকায় বিমান চলাচল বন্ধ  » «   হোটেলে যখন একা, তখন মেনে চলুন কিছু বিষয়!  » «   এবার মাত্র ২০০০ টাকার মধ্যে স্মার্টফোন  » «   আ’লীগের আলোচনা সভা বিকেলে  » «   অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার  » «   মেয়েকে দিয়েই অন্য মেয়েদের ফাঁদে ফেলতেন এই বাবা!  » «   বিজয় দিবসে দুর্বৃত্তদের পেট্রোল বোমায় দগ্ধ ২  » «   ফ্রান্স দূতাবাসে বিজয় ও আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালিত  » «   সামান্য সেলফির জন্যই বিপদে পড়লেন দেশ সেরা সুন্দরী!  » «   ফিলিস্তিনি ধনকুবেরকে আটক করেছে সৌদি  » «   সেনা কর্মকর্তার বাসা থেকে কিশোরী গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার  » «  

সাবেক শিবির সভাপতির ইউর্টান!



সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জুর (ডুব_এবং_ঢাকা_এট্যাক) সিনেমা দু’টি সিনেমা হলে গিয়ে দেখা এবং তার পরবর্তী নিজের ফেজবুক ওয়ালে সিনেমা দিয়ে রিভিউ দেওয়া নিয়ে নিজের দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা রকম ক্ষোভ এবং নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। এদিকে মি. মঞ্জু ঘটনা সামাল দিতেপাল্টা জবাব হিসেবে নিজের ফেজবুক ওয়ালে দশ পর্বের মুখোশের বয়ান তুলে ধরেন। এতে তার জীবনের স্মরণীয় সব ঘটনা, জামাত নেতাদের সাথে নানা বিষয়ে বিবেদ, পার্টির কর্মী এবং তার অনুসারীদের ভবিষ্যত কর্মপন্থার একটি বিস্তারিত পথ দেখিয়ে দেন।

প্রসঙ্গক্রমে তিনি জামায়াতের নানা ঘোঁড়ামী এবং কুসংস্কারের কথা তুলে ধরেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, জামায়াতের দন্ডপ্রাপ্ত সাবেক আমীর মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারী আলী আহসান মু. মুজাহিদ, জামাত নেতা মীর কাশেম আলী এবং আরো বেশ কিছু সাবেক এবং বর্তমান নেতার নাম তুলে ধরে নানা রকম প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি সমালোচনা করেন ইসলামের নামে নারী নেতৃত্বের বাস্তবতার, তিনি সুদমুক্ত অর্থনীতির কথা বলে সুদযুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করার প্রসঙ্গেও কথা বলেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন জামাত-শিবির তাদের কর্মপদ্ধতির মধ্যে ইউর্টান করে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার ইহা একটি পরিকল্পিত কৌশল। পাঠকদের সুবিধার্থে তার পোষ্টগুলো হুবহু তুলে ধরা হলো।

#মুখোশের_বয়ান••• (প্রথম অংশ)
মোটমুটি একটা ঝামেলায় পড়েছি।
বন্ধুদের কেউ কেউ খুব অসন্তুষ্ট।
আমি কেন মুভি দেখলাম, ফেসবুকে সেটার রিভিউ-ই বা লিখতে গেলাম কেন? এটা খুবই বেমানান, আমার মত লোকের সাথে এটা যায় কিনা! এটা আমার কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়… ইত্যাদি ইত্যাদি।
বন্ধুত্বের ভালোবাসা এবং অনুরাগ এমনই তো হওয়া উচিত। তারা আমার যে কাজে খুশী হবেন- বাহবা দেবেন। যেটা পছন্দ করবেন, বেমানান মনে করবেন- তা খোলামেলা বলবেন। কিন্তু আমার খারাপ লাগছে কেন?
আসলে সমলোচনা আমরা কেউ সহ্য করতে পারিনা। উপরে উপরে সুশীল, উদার, মুত্তাকি, মোহসেন ভাব নিয়ে থাকি। দিনশেষে আসলে আমি যে-ই সে-ই। অতএব আমি আমার সে সব বন্ধুদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই যারা আমার ‘ডুব’ ও ‘ঢাকা এট্যাক’ সম্পর্কিত পোস্টে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আমার সম্পর্কে আপনাদের উচ্চ নৈতিক ধারনার জন্য আমি অতিশয় কৃতজ্ঞ। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনারা যে ধারনা, বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে আমাকে দেখেন বা দেখতে চান সেটার যোগ্য আমি নই, কস্মিনকালেও ছিলাম না।
১৯৯১-৯২ সালে আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজ ক্যম্পাস বিভাগে দায়িত্ব পালন করি। কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমার লেখা একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকের নাম দিয়েছিলাম ‘মুখোশ‘। নাটকের গল্পটা লিখতে গিয়ে আমি টের পেলাম বারবার আমার স্বরুপ আর মুখোশ টাই আমি লিখছি। আসলে আমরা নিজের অজান্তে সবাই মুখোশ দেখতে পছন্দ করি। স্বরুপের আচ্ছাদন একটু বিমুক্ত হলেই শেষ। ছিঃ ছিঃ রিঃ রি….

আপনারা আজ যেভাবে বললেন সবকাজ সবাইকে মানায় না! এটা আপনার জন্য দৃষ্টিকটু! বিশ্বাস করুন ছাত্র আন্দোলনের জীবনে প্রত্যেক ছত্রে ছত্রে একথা আমাকে হজম করতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ক্লাসে পড়া অবস্থায়, শীর্ষ দায়িত্বপালন কালে আমি যখন মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, টেবিল টেনিস, ক্যারম, ব্যডমিন্টন ইত্যাদি খেলতাম। ফ্যাকাল্টিতে মিছিলে হাত তালি দিয়ে প্যারডি গাইতাম তখন প্রত্যেক বৈঠকে আমার প্রতি কমন এহতেসাব থাকতো যে “এটা আমার করা উচিত নয়- বেমানান”!কিন্তু আমার বেহায়া প্রবৃত্তি সাময়িক বাঁধ মানে ঠিকই পরক্ষণেই ধ্বসে পড়ে ফিতরাত বা স্বকীয়তার কাছে। আমাকে অনেকে প্রশ্ন করে পারিবারিক এত বিরোধীতা মাড়িয়ে আপনি আন্দোলনে এতদূর সক্রিয় হয়েছিলেন কীভাবে? এর পেছনে বেশী অবদান কার? আমি বলি ‘আমার পরিবারের’। তাদের নির্দয়, নির্মম, অযৌক্তিক বাঁধা আমাকে এই আন্দোলনে দৃঢ়ভাবে শামীল হতে প্রেরণা যুগিয়েছে।

২০০২ সালের বার্ষিক সম্মেলনে অনেকটা অকস্মাৎ আমার উপর অনাকাংখিত ভাবে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব অর্পিত হয়। আমি তখন ঢাকা শহরতো দূরের কথা পল্টন থেকে কলাবাগানের রাস্তাটাও ভালো করে চিনতাম না। কী কারণে অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল আমার প্রিয় দায়িত্বশীল নজরুল ইসলাম (বর্তমানে ইউকে সিটিজেন ও বার-এট-ল) ভাইয়ের স্থলাভিসিক্ত আমাকে করা হয়েছিল তা এখনো আমার কাছে রহস্যাবৃত। আমার স্পষ্ট মনে আছে সম্মেলন শেষে সবাইকে বিদায় দিতে দিতে অনেক রাত হয়ে যায়। বুলবুল ভাই গাড়ি বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে রিক্সায় চেপে বসলেন। সবাইতো অবাক! নতুন সিপি, সেক্রেটারি জেনারেল গাড়িতে না গিয়ে রিক্সায় যাবেন?
বুলবুল ভাই কড়া ধমক দিয়ে কলাবাগান অভিমুখী সবাইকে গাড়িতে উঠতে বললেন। আমাদের রিক্সা শুনশান রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে। আমার ভেতর তখনো ঘোর।
বুঝতে পারছি বুলবুল ভাই আমাকে কিছু বলতে চান- একা একা। গাড়িতে অন্যকেউ না থাকলেও ড্রাইভার তো থাকে, তাই সমস্যা। নিস্তব্ধ রাজপথ কোন সাড়া শব্দ নেই মাঝে মাঝে ট্রাকের বিচ্ছিরী গর্জন। রিক্সা চলতে চলতে কখন যে কাটাবনের কাছাকাছি চলে এসেছে খেয়ালই করিনি। বুলবুল ভাই তবুও চুপ, এরকম নীরবতা বার্তা দিচ্ছে তিনি এখন কঠিন কিছু কথা বলবেন। আমার খুব অস্বস্তি লাগছিল। তাঁকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ আমি আনমনে হেঁড়ে গলায় ফকির লালনের একটা গান গেয়ে উঠলাম, ও- যার আপন খবর আপনার হয় না…. একবার আপনারে চিনতে পারলে রে… যাবে অচেনারে চেনা…..! বুলবুল ভাই খপ্ করে আমার বামহাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন- আহ্ এসব কী করেন!
ছেলেমানুষী আপনার কখন যাবে?
প্রতি উত্তরে আমি বলেছিলাম, আমার ছেলেমানুষী কখনোই যাবেনা। আপনি আমাকে কেন এরকম একটা দায়িত্বে চিন্তা করলেন?তিনি মিষ্টি করে ধমক দিয়ে বললেন- দায়িত্বে আমি চিন্তা করিনি সংগঠন চিন্তা করেছে। মনে রাখতে হবে আপনি এখন বড় দায়িত্বশীল। অতএব আপনাকে সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। যা খুশী তা করা যাবেনা। তাৎক্ষণিকভাবে আমার চোখে ভীষন কান্না এসে দমকে উঠলো, আমি রিক্সার মধ্যে তাঁকে জাপটে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম- আমি পারবো না বুলবুল ভাই আমাকে মাফ করে দেন। তিনি আদরে আমার পীঠে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন- না না আপনি পারবেন।

কিন্তু আমি পারিনি, সত্যিই পারিনি। আমার মুখোশ বারবার আলগা হয়েছ… (অসমাপ্ত)

( So Sorry, মুখোশের বয়ান অনেক লম্বা হয়ে যাচ্ছে, তাই অসমাপ্ত থাকলো, সময় পেলে বাকী কথা গুলো লিখবো)

#মুখোশের_বয়ান•••দুই••পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়…

২০০৩ সালে এসএসসি কৃতি ছাত্র-ছাত্রী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হচ্ছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে। সরকারর একাধিক মন্ত্রী মহোদয়সহ বিশিষ্ট অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। খুব জাঁকজমক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শিল্পীরা আমাকে মঞ্চে আহবান করলেন, আমি মঞ্চে গেলাম। তাদের সাথে হাতে তালি দিয়ে একটি কোরাস জারী গান গাইলাম: ”দেখো নকলের আসায় শহর ছাইরা যায়… সারা বছর আড্ডা মাইরাও ফার্স্ট ডিভিশন পায়… “ সেদিনও অনেকে বিরক্ত হয়েছিলেন, দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন- তুমি সিপি, তোমার সেটা করা মানানসই হয়নি। সাবেক রাস্ট্রপতি ডাক্তার বদরুদ্দৌজা চৌধুরী সাহেবের সাথে একদিন এক সুযোগে লম্বা গল্প হয়েছিল। জানতে চেয়েছিলাম তার বঙ্গভবনের সেই দিনগুলোর কথা। -যখন বঙ্গভবনে সপ্তাহে একদিন তিনি রোগী দেখার ঘোষণা দিলেন তখন নাকি প্রবল আপত্তি উঠেছিলো। সরকার, যথাযথ কতৃপক্ষ, নিয়োজিত প্রটোকল সবাই বিব্রত। এ কেমন কথা! রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে রোগী দেখবেন? তিনি তখন বললেন- বঙ্গভবনে অসুবিধা
হলে তাহলে আমার চেম্বারে দেখবো। প্রটোকল বিভাগ জানালো এটাতো আরও অসম্ভব! সপ্তাহে একদিন ঢাকার রাস্তা আটকে তিনি রোগী দেখতে যাবেন-আসবেন! এতে ভোগান্তি ঝামেলা বাড়বে এবং ব্যাপক সমলোচনা হবে। তিনি আফসোস করে বললেন- তারা বুঝতে চাইলোনা আমি শুধু একজন রাজনীতিক নই, আমি একজন চিকিৎসকও। চিকিৎসা আমার পেশা ও প্রতিশ্রুতি।

একজন মানুষের একটি বড় পরিচয় থাকতে পারে কিন্তু তার সাথে অন্য পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য কী মুছে ফেলতে হবে! কে কী ভাববে বা মানুষের কী রকম ধারনা হবে সেজন্য কী নিজেকে কৃত্রিম খোলসে ঢেকে রাখতে হবে! আজ হঠাৎ বদরুদ্দৌজা চৌধুরীর সে কথাগুলো মনে পড়লো! আমারও একটা পরিচয় আছে। খুব বড় পরিচয়। যে পরিচয়ের সূত্রেই আমার প্রচুর বন্ধু ও শুভার্থী- আলহামদুলিল্লাহ! একজন আমাকে বললেন, সে পরিচয়ের সুবাদে
অনেকে আমার লেখা না পড়েও লাইক দেন। কথাটা সত্য, আমি প্রমাণ ও পেয়েছি অনেকবার। কিন্তু আমার এই পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যের বাইরে কী অন্যকোন পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারেনা? আমার কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে কিন্তু পেশাগত ভাবে মিশন ভিশন চুড়ান্তভাবে সেটেল হয় মিডিয়ায়। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ভিজ্যুয়াল মিডিয়া বা টেলিভিশনে। ইসলামিক টেলিভিশনের চাকুরী ছেড়ে আমি যখন দিগন্ত টিভিতে জয়েন করি আমার প্রথম দায়িত্ব ছিল প্রোগ্রাম বিভাগে। দিগন্ত কী ইসলামী ভাবধারার টিভি হবে না মূলধারার টিভি হবে? সেটা নিয়ে অনেক মত-দ্বিমত ছিল-— সে অনেক স্মৃতিময় কথা, অন্যসময় বলা যাবে।

দিগন্ত মূল ধারার টিভি হিসেবেই আত্মপ্রকাশক করে। নিউজ, টক-শো, গান, নাটক, সিনেমা, মিউজিকেল শো, হেলথ্ শো, কীচেন শো, লাইভ কনসার্ট সবই আছে। দিন দিন আমার উপর দায়িত্ব বাড়তে থাকে। আমাকে প্রিভিউ কমিটির মেম্বারও বানানো হয়। প্রিভিউ কমিটির কাজ কী! ঘন্টার পর ঘন্টা বসে নাটক, মিউজিক ভিডিও, ইংলিশ ডাব করা মুভি আর বাংলা ছায়াছবি দেখা। প্রিভিউ কমিটিতে প্রথম মুভি হিসেবে প্লেইস করা হয় অ্যালেক্স হ্যালী-র বিখ্যাত ছবি ‘দা রুটস’। রুটস দেখতে বসে আমিতো অবাক! এই ছবি দেখানো হবে দিগন্তে? যিনি আমাকে ঠেলে ঠেলে এসব দায়িত্ব দিচ্ছিলেন বিনা দ্বিধায় তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্পষ্ট করে বললাম “আমি পারবো না, এসব আমার কাজ না”।
তিনি বললেন, না পারলে বাদ দাও। উল্টো প্রশ্ন করলেন সব কাজ আর দায়িত্ব কী আমার? মিডিয়া করার জন্য তোমরাইতো উস্কানী দিয়েছিলে। অস্থির করে তুলেছিলে- আমাদের কোন মিডিয়া নাই কেন? এখন এসব কথা আমি শুনবো না। তাঁর কঠোর প্রত্যুত্তরে খুব অসহায় মনেহলো নিজেকে। কণ্ঠটা নরম করে বললাম, সারাজীবন যা শিখেছি, তা’লীম দিয়েছি, যা নিষেধ করেছি- নিজে সেটা করবো! মানুষ কী বলবে!
তিনি হাহ্ হাহ্ করে কিছুক্ষণ হাসলেন। তারপর বললেন- মানুষ কী বলবে সেটাকে খুব ভয় পাও তাইনা… ? (অসমাপ্ত – চলবে)

#মুখোশের_বয়ান_তৃতীয়_পর্ব•••পূর্ববর্তী লেখার ধারাবাহিকতায়••••

বুঝতে পারি তাঁর এই হাসিটা প্রকৃত হাসি নয়। তিনি আমাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসি মিলিয়ে গেল, সিরিয়াস মুড নিলেন তিনি। বলতে শুরু করলেন- চিন্তিত হবার কিছু নেই। পথ যত কঠিন হোক পথ পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং, বীমা, বিকল্প শিক্ষার স্রোতধারা এমনি এমনি একদিনে তৈরী হয়নি। অনেক কন্টকাকীর্ণ পথ ভুল বোঝাবুঝি, ফতোয়া, ব্লেইম গেম মোকাবিলা করে আগাতে হয়েছে। মনকে দৃঢ় রাখ, গায়ের চামড়া আরও শক্ত কর।
মিডিয়ার দখল একচ্ছত্রভাবে মিথ্যার কাছে, পঁচা লোকদের হাতে আমরা ছেড়ে দিতে পারিনা। সিনিয়র এবং এক্সপার্ট আলেমদের নিয়ে একটা কমিটি কর, যারা মিডিয়া সম্পর্কে মতামত দিতে পারেন। তাদের নিয়ে প্রয়োজনে ডে-লং অথবা কয়েকদিন সময় নিয়ে বস। তোমাদের যত খটকা যত আলোচনা সেখানে কর। কিন্তু মনেরাখবে, এটা এই জমানার কঠিন যুদ্ধ। যুদ্ধ মানে জীবন-মরন, কৌশল, স্বজন হারানো, বিকলাঙ্গ হওয়া, বিশ্বাস ঘাতকতা, নিষ্ঠুরতা, কখনো জয়, কখনো পরাজয়! যুদ্ধের কোন সহজ পথ নেই….!
তাঁর কথাগুলো আমার মাথায় ঢুকেনা, অপলক নেত্রে শুনে যাই, মাথা নেড়ে সায় দেই। মূলতঃ বিজ্ঞ আলেমদের নিয়ে কমিটি করার সিদ্ধান্ত পেয়ে আমি মহাখুশী। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী মেধাবী শ্রদ্ধাভাজন মোট ৭ জন আলেম কে নিয়ে কমিটি করা হয়। আলোচনার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় নির্ধারণ করি আমরা।
মোটাদাগে সেগুলো হলঃ
*আমরা যে কমার্সিয়াল এপ্রোচে টেলিভিশন পরিচালনা করতে চাই এবং চলমান ধারাকে (মেইনস্ট্রিম) অবলম্বন করে সামনে চলার চিন্তা করছি সে ব্যপারে তাদের মতামত জানা।
*নারীদের অনুষ্ঠানমালায় সম্পৃক্ত করা, বিশেষ করে মুখ খোলা রেখে নারী প্রেজেন্টারদের নিউজ পড়ানো।
*সংবাদ প্রচার, অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচারের জন্য আমরা যেহেতু বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে, সেখানে আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবেনা। তারা যা
বানিয়ে দিবে তাই প্রচার করতে হবে। এ বিষয়ে তাদের মন্তব্য ও মতামত।
*নিউজ এবং অনুষ্ঠানে যে মিউজিক ব্যবহার করা হয় এবং মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের সাথে যে গানের অনুষ্ঠান সে বিষয়ে আমরা কী করবো?
*আমাদের মিডিয়া কর্মী ও নীতি নির্ধারক যারা ইসলামী নীতির ওপর নিজেদের জীবন পরিচালনা করে আসছি এবং সে লক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাঁরা এরকম একটি চ্যানেলে কীভাবে কাজ করবো.. ইত্যাদি।

মক্কা, মদীনা, মিশর, মালোয়েশিয়া সহ টপ লেভেলের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর বিষয়ে বিশেষায়িত পড়াশোনা করা আলেমদের এই টীম ছিল অসাধারণ এক কম্বিনেশন। তাদের জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ, ডিবেট, রেফারেন্স এবং শরীয়াহ সম্পর্কিত গভীর পান্ডিত্বে আমরা বিমোহিত হয়েছি। ৩ দিন ধরে সকাল-বিকাল আমাদের আলোচনা চলে। এই ডিস্কাশ্সন আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। আল্লাহ যদি সাহস আরও বাড়িয়ে দেয় কখনো না কখনো পাবলিক স্পেসে এসব স্মৃতি নিয়ে বিস্তারিত লিখার আশা আছে।
প্রথম দিন আলোচনা শুরু হয় ইসলামের আলোকে একটি টিভি চ্যানেলের নীতিমালা প্রসঙ্গে।
কমিটির একজন সদস্য অত্যান্ত নেতিবাচক মুডে ট্রাডিশনাল ওয়েতে আলোচনার সূত্রপাত করেন। তিনি বলেন আপনারা যে বিষয়গুলোতে আমাদের মতামত চেয়েছেন আমার জানামতে তার কোনটাই সুস্পষ্টভাবে ইসলাম অনুমোদন করেনা। এমনকি মেয়েদের মুখ খোলা রেখে খবর পড়াও না। তিনি পবিত্র ক্বোরআনের সূরা নূর, আহযাব সহ বিভিন্ন অংশ থেকে উদ্ধৃত করে দলিল দেন।
কমিটিতে যিনি সিনিয়র ছিলেন তিনি মজা করে তাঁকে প্রশ্ন করেন ছেলেরা নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করে খবর পড়তে পারবে কিনা? সূরা নূরের গাইড লাইন ব্যখ্যা করে তিনি বলেন নারীর সৌন্দর্য যদি চেহারায় হয় তাহলে পুরুষের সৌন্দর্য কোথায়? তার মেকআপ করা, স্মার্ট চেহারা কী নারী দর্শকদের জন্য দেখা জায়েজ? সবাই তাঁর কথায় হেসে ওঠে। তিনি বলেন এই আয়াত কে যদি বেসিস ধরি তাহলে সহজ নীতি হলো পুরুষের জন্য আলাদা টিভি আর নারীদের আলাদা টিভি করা। তিনি হাসতে হাসতে বলেন বাসায় বাসায় পাহারা বসাতে হবে কেউ নিজেরটা বাদ দিয়ে অন্যেরটা দেখছে কিনা। আলোচনা বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠলো, শুরু হলো দারুন বিতর্ক……. (অসমাপ্ত•••••চলবে)

(পূণশ্চঃ আমি দূঃখিত যে লেখা অনেক লম্বা হচ্ছে। প্রাসঙ্গিকতাও নেই অনেকক্ষেত্রে। যেহেতু মনটা সত্যি সত্যি একটু খারাপ হয়েছে অনেক কথা লিখতে চাই। আবেগের কারণে মাত্রাজ্ঞান ও পরিশীলতা ক্ষুন্ন হলে আমাকে নিঃশর্তে ক্ষমা করবেন। কয়েক লাইন লিখে চোখ আর বুকে জমা কষ্ট বাস্পায়িত হচ্ছে। তবুও লিখবো যদি আপনারা ধৈর্য ধরে কষ্ট করে পড়েন )

#মুখোশের_বয়ান_চতুর্থ_ (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়…)

প্রথম দিনে লাঞ্চের পূর্ব পর্যন্ত আলোচনার ধারা ছিল গতানুগতিক। সুরা নুরের ব্যাখ্যা এবং ছেলে মেয়ে কেউ খবর পড়তে পারবে কি পারবেনা তা নিয়ে চলেছে মজাদার বিতর্ক। একজনের মত হল মেয়েরা খবর পড়তে পারে কোন বাধা নেই, তবে তাদের চেহারা দেখানো যাবেনা মুখ ঢেকে রাখতে হবে।
আরেকজন সাথে সাথে বললেন ছেলেদেরও তাইলে মুখ ঢেকে খবর পড়তে হবে। অথবা অনেকে আছে একই সঙ্গে ছেলে মেয়ের কণ্ঠে কথা বলতে পারে। একবার সে ছেলের কণ্ঠে খবর পড়বে আরেকবার মেয়েলী কণ্ঠে। মুখ যেহেতু ঢাকা থাকবে বুঝা যাবেনা আসলে সে ছেলে না মেয়ে।

হাস্যোচ্ছলে অন্যজন বললেন বাদ দাও তোমরা বরং কিছু ‘জীন’ সংগ্রহ করতে পারো কিনা দেখ খবর পড়ার জন্য। সবাই তাঁর কথায় আরেক পশলা হেসে ওঠে। আমাদের নির্বাহী পরিচালক মরহুম একেএম হানিফ ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক। তিনি মুখে হসি টেনে বিজ্ঞ আলেমদের উদ্দেশ্য করে বললেন আমরা আপনাদের মতামত জানতে এসেছি মেয়েদের ব্যাপারে, কিন্তু আপনারা এখন আমাদের ছেলেদের খবর পড়াও বন্ধ করার কথা বলছেন। আমাদের ছালা গেল; আমও গেল। দুপুরের লাঞ্চের পর ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এই সেশনটা ছিল সম্পুর্ণ একাডেমিক। এই পর্বের আলোচনার শুরুতে আমাদের তৎকালীন হেড অব প্রোগ্রাম, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক উপ-মহাপরিচালক(অনুষ্ঠান) খ্যাতিমান লেখক, নির্মাতা ও পরিচালক জনাব মাহবুবুল আলম গোরা সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে লম্বা কিছু কথা রাখলেন।
তিনি বললেন- আমরা আসলে আপনাদের কাছে ফতওয়া জানতে আসিনি। পর্দার বিধান সম্পর্কে আপনারা যে সকল রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন এসব কমবেশি আমরা সবাই জানি। আমরা মূলতঃ আপনাদের গাইড লাইন চাই। মূলধারার টেলিভিশন হিসেবে আমরা যে চলার চিন্তা করছি সেটার ব্যাপারে আপনাদের মতামত জানতে চাই।
আমরা এমন একটা সমাজে আছি- সেখানে সত্যপন্থী, মানবিকবোধে বিশ্বাসী মানুষগুলোর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কোন ঠাই নেই। এই অঙ্গন যারা দখল করে আছে তাঁরা যা খাওয়াচ্ছে আমাদের তাই খেতে হচ্ছে। তাঁরা যেটা শিখাচ্ছে আমাদের তাই শিখতে হচ্ছে। এদের স্রোত এবং ধারা খুবই শক্তিশালী। তাদের সাথে আছে সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র, এমনকি সীমানা পেরিয়েও আছে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা। আমরা সেখানে প্রথমবারের মত পরিবর্তনের আওয়াজ তুলতে চাই। সেই আওয়াজ তোলার জন্য আমাদের দুটি পথ খোলা- ১) পরিপূর্ণ ইসলামের রুপ নিয়ে হাজির হওয়া। ২) চলমান ধারার মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে শুদ্ধতার জন্য কাজ করা এবং পরিবর্তনের সূচনা করা। ওরা যেসূরে গান করে হয়তো প্রথম প্রথম আমরাও সে সূরে গাইবো কিন্তু আমাদের প্রেজেন্টেশন হবে ভিন্ন। ওরা যে নাটক করছে একই শিল্পী দিয়ে, পরিচালক দিয়ে
আমরাও কাজ করবো কিন্তু সেটার বক্তব্য হবে গঠনমূলক জীবনমুখী। তিনি আরও বললেন, সিনেমা বা নাটকে আমরা যখন এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাই তখন দুটো পথ আমরা বেছে নিই একটি হচ্ছে কাটওয়ে এবং অন্যটি হল ডিজল্ভ-ওয়ে। ডিজল্ভওয়েতে একটি দৃশ্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় আরেকটি দৃশ্য দীপ্তমান হয়, দর্শকের চোখে সেটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়না। কাটওয়ে হল একটা থামিয়ে বা কেটে আরেকটাতে চলে যাওয়া, দর্শকের চোখে এটা ধাক্কা লাগে। আমরা আসলে দিগন্ত কে নিয়ে ডিজল্ভওয়েতে কাজ করতে চাই।

সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনলেন। এরপর তিনি আরও একটু যোগ করে বললেন, ইসলাম একজন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত ‘মুলনীতি’ সেটা পরিস্কার। কিন্তু এখানে আমরা আমাদের এই পদক্ষেপ কে ‘নীতি’ হিসেবে নয় নীতি বাস্তবায়নের ‘কৌশল’ হিসেবে নিতে চাইছি। ইসলামের আলকে আমাদের এই ‘কৌশলনীতি’ গ্রহণযোগ্য কিনা সেটাই আপনারা আপনাদের গভীর জ্ঞান এবং বিশ্লেষণ থেকে আমরা জানতে চাইছি। গোরা ভাইয়ের বক্তব্যে সবাই নড়ে চড়ে বসে। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলেনা। আমি নিজেও ভাবতে থাকি, অনেক জটিল এবং কঠিন আলোচনার দিকে যাচ্ছি কী আমরা! নীরবতা চলতে থাকে অনেকক্ষণ। বলে রাখা ভালো ওলামাদের নিয়ে সভাটি হচ্ছিল, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড রুমে। নীরবতা ভাঙ্গেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা।

তিনি বললেন, আপনাদের খোলামেলা কথা শুনে খুশী হলাম। আপনারা আমাদের কাছ থেকে কী চান স্পষ্ট করে বলায় আমাদের সুবিধা হল। আসলে ইসলামী শিক্ষানীতি বলেন আর অর্থনীতি বলেন বা মিডিয়া নীতি বলেন তা স্থির করা এবং প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ। কোন ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিগোষ্ঠীর পক্ষে তা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবুও আমরা যার যার ক্ষেত্রে চেষ্টা করে যাচ্ছি। সেক্ষেত্রে শরিয়া ইস্যুতে কমপ্রোমাইজ আমাদের করতেই হচ্ছে। সরকারী বিষয়াদি, আমলাতান্ত্রিক অনিয়ম, দুর্নীতি এগুলোকে মেনে নিয়েই আমাদের চলতে হচ্ছে। আমরা যেহেতু পরিপূর্ণ ভাবে ইসলাম মেনে চলতে পারছিনা তাই সব বাদ দিয়ে নিজে হকের উপর বসে থাকবো কোন পরিবর্তনের কাজ করবনা এটা ইসলাম সম্মত কথা নয়। আপনারা যে এই জন্য ভেবেছেন তাতেই আপনারা ইতিমধ্যে বড় একটি সওয়াবের কাজ করেছেন বলে মনেকরি।

কিন্তু সমস্যা হল এই বাংলাদেশে কোন পরিবর্তনের কাজ করা খুবই জটিল, কঠিন এবং অসম্ভব! এখানে আপনি ইসলামের নামে কোন কাজ করতে যাবেন, সাথে সাথে সেখানে প্রশ্ন আসবে এটা ইসলামে জায়েজ কিনা, এটা কোরআন-হাদিস সম্মত কিনা, ইসলামের নীতি এখানে মানা হয়েছে কিনা, দাঁড়ি লম্বা না বেঁটে! ইত্যাদি ইত্যাদি। আর আপনি যদি ইসলাম নাম বাদ দিয়ে বা অন্য নামে কিছু কাজ করেন তাহলে বলবে ওই দেখ মাউলানা কী করে? এসব কাজ করার কী লোকের অভাব? উনার কেন এসব করতে হবে? আপনি সরকারের মাইরও খাবেন, নিজের লোকদের মাইরও খাবেন।
মুরুব্বীর কথার সুত্র ধরে আলোচনা গড়ায় একটি আনইসলামিক সমাজ থেকে ইসলামিক সমাজে রুপান্তরের ধারা বা পরিবর্তনের বিভিন্ন ইতিহাসের দিকে। উঠে আসে রাসুল (সঃ) এর জীবনের অসাধারণ কিছু তথ্য এবং বিশ্লেষণ, সাহাবীদের জীবনের অনেক মূল্যবান রেফারেন্স। দেশে দেশে যারা মুজাদ্দিদ ছিলেন তাঁরা কীভাবে নিজ লোকদের দ্বারাই অবহেলিত, অবমুল্লায়িত, নির্যাতিত হয়েছেন তাঁর কিছু ঘটনা। এমন কিছু ঘটনাও উঠে আসে যাতে পরিবর্তন কামীদের বিদ্রোহী, পথভ্রষ্ট, বাতিল বলে একঘরে করে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে কেউ কেউ বলেন- যেখানে ছবি তোলা নিয়ে বিতর্ক, মাইকে আজান দেয়া, কুরআন তেলাওয়াৎ, টেলিভিশন দেখা এবং সেখানে ইসলামী আলোচনা করা ইত্যাদি নিয়ে আপত্তি সেখানে আপনারা চলমান ধারার গান বাজনা নাটক করে চিন্তা জগতে পরিবর্তন আনার কথা ভাবছেন কীভাবে?
যাইহোক প্রথমদিন শেষে আমরা বুঝতে পারি আমরা যা করার চিন্তা করছি তা খুবই কঠিন এবং সমস্যা বহুল কাজ। আমাকে হাতাশা আচ্ছন্ন করে। মন বারবার বলছে, এটা আমার কাজ নয়। পরদিন আমি হাজির হই সিপাহসালারের কাছে। এবার আমি খুব স্পষ্ট এবং স্থির। আমি পারবোনা, এটা একটা ফেতনার কাজ হবে। দরজা খুলে তাঁর রুমে ঢুকলাম খুব উদ্ধতের সাথে…… (অসমাপ্ত… চলবে)

#মুখোশের_বয়ান_পঞ্চম… (পূর্ববর্তী আলোচনার ধারাবাহিকতায়)

আমি তাঁর সামনের চেয়ারে বসে আছি অনেক্ষণ। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাতে থাকা পত্রিকা পড়ছেন। কোন কথা বলছেন না। একসময় পত্রিকা থেকে মাথা তুলে বললেন কী খবর? আমি মিটিং এর বিস্তারিত তাঁকে রিপোর্ট করলাম। তিনি মনযোগ দিয়ে শুনলেন, দুয়েকটি প্রশ্ন করলেন তারপর বললেন, যে কয়দিন দরকার ডিস্কাস্শন চলুক। এই ব্রেন স্টর্মিং এবং ডিবেট খুব দরকার আছে। কোন সংকোচ ছাড়াই আমি এবার সরাসরি বললাম, আমার মনেহয় আমাদের এ পলিসি গ্রহণ করা উচিত হবেনা।

– কেন?
– খুব সমলোচনা হবে। যেখানেই যাবো সেখানেই প্রশ্নের সম্মুক্ষীণ হতে হবে।
– অবশ্যই সমলোচনা হবে, কিন্তু তাতে কী!
– আমাদের কর্মীদের আমরা এতদিন গান, বাজনা, নাটক, সিনেমা দেখতে নিষেধ করেছি। যারা দেখেছে তাদের ভর্ৎসনা করেছি আর এখন আমরা নিজেরাই সেটা
বানাবো! সম্প্রচার করবো! এটা কনট্রাডিক্টরী এবং নৈতিক দিক থেকে সিরিয়াস মুনাফেকী। আন্দোলনের জন্যও এটা হবে ইমেজ ডেমেইজিং।
– তিনি মুখে হাসি টেনে বললেন রাইট, ইউ আর এবসোলিউটলি রাইট। ভীষন সমলোচনা হবে এবং তা সহ্য করেই কাজ করে যেতে হবে।
– এটা খুবই বাজে ব্যাপার হবে, আমাদেরকে যারা আদর্শ মনে করে হৃদয়ে ঠাই দিয়েছে তাঁরা খুব হতাশ হবে। মনে করবে আমাদের কথা এবং কাজে মিল নেই। আমাদেরকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করে বলবে উনি যদি এরকম করতে পারেন, আমরা কেন পারবোনা!
তিনি আমাকে শান্তনা দিয়ে বললেন, একটু থামো, স্থির হয়ে বসো। তোমার সব কথাই ঠিক, এই সমস্যাগুলো আছে বলেইতো আমরা বিশেষজ্ঞদের মতামত জানতে চাইছি। একটি ইসলামী টিভি খোলা তো কোন সমস্যা না।
আমরা যদি ইসলামিক টিভি খুলি সবাই বাহবা দিবে, কিন্তু কয়জনে দেখবে?
বাংলাদেশ টেলিভিশন ভিউয়ারস রেটিং সার্ভে অনুযায়ী প্রায় ৬৫ ভাগ পুরুষ টেলিভিশনে নিউজ দেখে। আবার মহিলাদের ৫ ভাগ ভিউয়ারসও নিউজ দেখেনা। তাঁরা দেখে নাটক, সিরিয়াল, সিনেমা, রান্নার অনুষ্ঠান, সাজসজ্জা ইত্যাদি। বাচ্চাদের ৯০ ভাগ কার্টুন দেখে। ইয়াং জেনারেশন দেখে খেলা, মিউজিক, ফিকশন মুভি ইত্যাদি। তাছাড়া বাংলাদেশে ইনডিয়ান টিভি’র জনপ্রিয়তা এখন সবচেয়ে বেশী। ইনডিয়ান চ্যানেল গুলো সবচাইতে পপুলার। বাংলাদেশে যে ফ্যামিলিতে টিভি আছে এবং ডিশ লাইন আছে সে বাসায় ইনডিয়ান টিভি দেখা হয়না এরকম কদাচিৎ পাওয়া যেতে পারে। তুমি চাইলে একটা সার্ভে করে দেখতে পারো, যাদের তুমি খুব পবিত্র মন নিয়ে শ্রদ্ধা কর, তাদের বাসায় বাচ্চারা টিভি তে কী অনুষ্ঠান দেখে? মেয়ে বা নারীরা কোন অনুষ্ঠান দেখে?
শরিয়ার মাণদণ্ডে একটি পুতঃ পবিত্র ইসলামিক টিভি অবশ্যই থাকতে হবে কিন্তু সেটাতো সীমিত একটা শ্রেণীকে কাভার করছে মাত্র। তুমি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবে, ইসলামিক টিভি’র প্রশ্নোত্তরের অনুষ্ঠানের চাইতেও এনটিভি বা এটিএন এর ইসলামী অনুষ্ঠানের দর্শকপ্রিয়তা বেশী। তাছাড়া একটি ইসলামিক টিভি আছে, তাদের নিজেদেরই কমারসিয়াল্লি টিকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে, কারণ তাদের ভিউয়ারস মাত্র ২-৩ পারসেন্ট সেখানে আমারা গিয়ে নিজেরাও দুর্বল হবো তাদেরও দুর্বল করে ফেলবো। তাঁর কথা গুলো আমি ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাই, মাথায় ঢুকাতে চাইনা। আমি শুধু বললাম, সব ঠিক আছে কিন্তু আমদের সম্পৃক্ততায়, আমাদের হাত দিয়ে এটা হওয়া ঠিক হবেনা। আমার কথায় তিনি কিছুটা বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ করলেন না। তিনি বললেন, এতদিন শুনেছি তুমি খুব সাহসী।
– না আমি সাহসী নই, খুব ভীতূ। আপনি ভুল শুনেছেন।
– স্রোতের বিপরীতে চলার হিম্মত নাই তুমি কীসের মুজাহিদ? (আমি চুপ করে থাকি)
এবার তিনি বললেন, ‘জাহেলিয়াতের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্যতা সম্পন্ন কর্মী’ তো তুমি নিজেই হতে পারনাই । (আমি চুপ, কিছুক্ষণ তিনিও চুপ থেকে তারপর আবার শুরু করলেন)

তোমার সব কথা আমি মেনেনিলাম, কিন্তু তা সত্বেও এই কাজের সূত্রপাত কাউকে না কাউকে করতে হবে। মরা একসময় নির্বাচনী পোস্টারে প্রার্থীর ছবি ব্যবহার করতাম না। পরে যখন ব্যবহার শুরু করলাম বেশ সমলোচনা হলো। জায়েজ-নাজায়েজ প্রশ্ন উঠলো! আমরা কোন জবাব দিতাম না। সময়ের ব্যবধানে প্রশ্ন কমতে থাকে। এখন কেউ প্রশ্ন করেনা বরং সুন্দর ভালো ছবি ব্যবহার করার জন্য তাগাদা দেয়। ছাত্রজীবন থেকে মেয়েদের সাথে কথা বলা, পরদা মেনে চলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কঠোর তত্ত্বাবধান ছিল। বহু ভাইদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। আমরা বলেছি নারী নেতৃত্ব হারাম। কিন্তু এখন আমরা যাদের সাথে এক জোট হয়ে এক টেবিলে বসে আন্দোলন করছি সেই জোটের নেতা একজন নারী। ঘণ্টার পর ঘণ্টার কর্মসূচি নিয়ে মুখোমুখি আলোচনা হচ্ছে।

আমাদের ইফতার মাহফিলে সম্মানের সাথে প্রধান চেয়ারে বসিয়ে গুরুত্বের সাথে তাঁর বক্তব্য শুনছি আমরা। এগুলো নিয়ে এখনও প্রশ্ন হয়? আমরা জবাব দেই না এড়িয়ে যাই। শরিয়াত, হালাল, হারাম নিয়ে বিতর্ক যত কম করা যায় তত ভালো। শরিয়াতে নামাজের জন্য অজু করা ফরজ। অজু করে মানুষ হাত, মুখ পরিষ্কার করে। কিন্তু যখন পানি পাওয়া না যায় তখন তায়াম্মুম করা নিয়ম। তায়াম্মুমে উল্টো হাতে মুখে ময়লা অর্থাৎ ধুলো বালি লাগে। তবুও তাতে পবিত্রতা হিসেবে ধরা হয়। শরিয়াত এর পাশাপাশি পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট ইসলামে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরাতো বলিনি বা বলছিনা আগে আমরা যা করেছি তা ভুল আর এখন যা করছি তা জায়েজ। মানুষ তাঁর নিজ নিজ জ্ঞান ও বিশ্লেষণ দিয়ে করণীয় ঠিক করবে, গ্রহণ করবে বা প্রত্যাখ্যান করবে। আমাদের শুধু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের নিয়ত ও লক্ষ্য ঠিক আছে কীনা? নাকি আমরা স্রোতে বিলীন হয়ে যাচ্ছি! তাই তোমাকে বলছি, কিছু প্রশ্ন সময়ের ব্যবধানে জবাব হয়ে যাবে। ফেইস করতে গেলে জটিলতা বাড়বে। তাই এভয়েড করা ভালো। আমি নাছোড়বান্দা, তারপরও বললাম- টিসি, টিএস, আলোচনা সভা, এসব জায়গায় ভাইয়েরা প্রশ্ন করলে আমি কী বলবো?
– কিছুই বলবেনা।
– চুপ থাকবো?
– না বলবে ২ বছর পর্যন্ত এসব প্রশ্ন করা যাবেনা, ২ বছর পর দেখবে আর এসব প্রশ্ন করবেনা।

হটাত তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন তুমি কী নেতা হতে চাও? আমি বললাম, আমিতো নেতা হয়েই আছি।
– ও আচ্ছা তাতো ঠিক বটে। যদি তুমি এই কাজে নিজেকে কুরবানী করতে চাও তাহলে নেতাগীরি বাদ দিয়ে কর্মী হয়ে যাও।
টিসি, টিএস, সভা-সমাবেশ, আলোচনা সভায় বক্তৃতা দেয়ার লোকের কী অভাব আছে? সবাই লোক গঠনের কাজ করলে, সভাপতি, আমীর, চেয়ারম্যান, এমপি হলে বিপ্লবের সহায়ক কাজগুলো কে করবে? তিনি বললেন, কামারুজ্জামান ভাই আমার সেক্রেটারি ছিল, মাওলানা তাহের আমার কর্মী, তাদের সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পজিশন আমার উপরে। সো হোয়াট! অনেকে অনেক কথা বলেছে আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমার মনে কখনো কষ্ট অনুভুত হয়নি। তুমি তোমার পথ দেখ- নিজের সুনাম, পরিচয়, দ্বিধা এসব ঝেড়ে ফেলে যদি অন্তরালে যেতে পারো। মিছিল সমাবেশে হাত তালি, পত্রিকায় ছবি ছাপা, টিসি, টিএস এর আবেগময় আলোচনা যদি সেক্রিফাইস করতে পারো তাহলেই কেবল তোমার পক্ষে নেতা থেকে কর্মী হওয়া সম্ভব…..! অসমাপ্ত…চলবে)

#মুখোশের_বয়ান_ষষ্ঠ…… (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়)

চিন্তা এবং দ্বিধা আমাকে জেঁকে ধরল। মনে হচ্ছে বুকের উপর একটি পাহাড় ধ্বসে বসে আছে। পরের দুদিন টানা সভা চললো বিশেষজ্ঞ ওস্তাদ আলেমদের নিয়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে ইসলামিক ভাবধারার টিভি অনুষ্ঠান, ছায়া ছবি নির্মাণের নানা উদাহরণ নিয়ে আলোচনা হয়। ইরান, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, কাতার, ইয়েমেন, মিশর ইত্যাদি দেশে তাঁরা কী করছে, কীভাবে করছে, ইত্যাদি।
সভায় একজন ছিলেন মদীনা থেকে পিএইচডি করা, অসাধারণ মেধাবী। মিউজিক সম্পর্কে অভূতপূর্ব কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করে তিনি বললেন, ইরান, মালয়েশিয়া, মিশর এসব দেশের ইসলামিক স্কলাররা মিউজিক ব্যাবহার কে বৈধ ঘোষণা করেছে। তাদের গবেষনা ও দলিলগুলো অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। এদের বড় বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে ইসলামিক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয় এবং এগুলো খুবই জনপ্রিয়।

একজন বললেন, আপনারা ইরানের পলিসি ফলো করতে পারেন। ইরানী মুভিতে মেয়েরা মাথায় হিজাব পড়ে। একেএম হানিফ ভাই বললেন, ইরানের সুবিধা হল তাঁরা যা করেছে তা রাষ্ট্রীয় ভাবে করেছে। ইরানের একটা রাষ্ট্রীয় ড্রেস কোড আছে। সেখানে নারীদের সবাইকে হিজাব পড়তে হয়। ইরানী ছবিতে যে মেয়েটাকে ভালো চরিত্রে দেখানো হচ্ছে অর্থাৎ নায়িকা সেও হিজাব পড়ে। আর যে মেয়েটাকে খারাপ বা বাজে ছেলেদের সাথে নাইট ক্লাবে যাওয়ার চরিত্রে দেখানো হচ্ছে সেও হিজাব পড়ে। এটা নিয়ে কোন কনফিউশন হয়না। কিন্তু আমাদের দেশে মাথায় হিজাব পড়ে মেয়েরা নাইট ক্লাব বা ব্রোথেলে যাচ্ছে এরকম যদি দেখাই তাহলে তা হবে খুবই সমস্যার। আপনারাই ফতওয়া দিয়ে বলবেন এখানে হিজাব কে অবমাননা করা হয়েছে। তাছাড়া এটা হবে একটা উলটা মেসেজ। পর্দা রক্ষা করতে গিয়ে বরং আমরা অন্য খারাপ মেসেজ দিয়ে বসবো। সবাই হানিফ ভাইয়ের কথায় সায় দেন। আলেমদের মধ্যে যিনি খুব সম্মানিত তিনি কিছু কথা বলতে চাইলেন, আমরা সবাই তাঁর দিকে মনযোগী হলাম।

তিনি বললেন, আপনারা ইসলামী ধাঁচের টিভি করতে চাননা, এর পেছনে আপনাদের যুক্তি হোল ইসলামিক টিভি দিয়ে মূল জনগনের কাছে পৌঁছানো যাবেনা। ইসলাম প্রাকটিসিং লোকেরাই মূলতঃ ইসলামিক টিভি’র ভিউয়ার। যেহেতু একটা ইসলামী টিভি আছে এবং সামাজিক ভাবে মূলধারার মানুষের কাছে ইসলামী টিভি’র কদর ও কমার্শিয়াল ভেলু কম তাই আপনারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছতে একটি মেইনস্টিম টিভি করতে চান। কিন্তু আপনারা যে টিভি করতে চাচ্ছেন সেটাতো অন্যগুলোর মতই। অন্য এতগুলো থাকতে একই রকম আরেকটা টিভি করে কী লাভ? আপনারা কীভাবে সাড়া ফেলবেন! আর আপনাদেরটা লোকেরা দেখবেই বা কেন? আমি ভেবেছিলাম এত বড় বড় লোকদের সামনে কথা বলবনা, কিন্তু
মুরুব্বির কথার জবাবে মুখ ফসকে কথা বেরিয়ে গেলো। – জী মাওলানা, আমরা চিন্তা করেছি আমরা মূলধারার টিভি হবো ঠিকই কিন্তু আমাদের নিউজ, উপস্থাপনা, প্রোগ্রাম, টেকনোলজি বেশ কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই ভিন্নতা থাকবে। মানুষ যেন বুঝতে পারে এরা ডিফারেন্ট। যত দিন যাবে সেটা আরও স্পষ্ট হবে। তিনি হাঁসতে হাঁসতে বললেন, বাগাড়াম্বর করে লাভ নাই দুই-একটা শুনাও তোমাদের বৈশিষ্ট যেইটা অন্যদের থেকে পৃথক হবে। মাওলানার জেরায় আমি মনে মনে একটু নার্ভাস হলেও পরক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম।

আমাদের মেয়ে প্রেজেন্টারেরা মাথায় হিজাব পড়ে নিউজ পড়বে, যেটা বাংলাদেশের অন্য কোন চ্যানেলে করেনা। আমরা নিউজ শুরু করবো আসসালামুয়ালাইকুম দিয়ে শেষ করবো আল্লাহ হাফেজ দিয়ে। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত আজান প্রচার করবো, কোন প্রাইভেট চ্যানেল সেটা করেনা। আমরা আধুনিক ভিজ-আরটি গ্রাফিক্স, এনিমেশন ইউজ করে লাইভ নিউজ করবো। আমাদের সেটআপ গেটআপ এবং টীম সম্পূর্ণ আধুনিক ও নতুন। ১১০ জন নতুন সংবাদ পাঠক, রিপোর্টার, প্রোডিউসার এবং কলাকুশলী আমরা এই সেক্টরে উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। অন্য টেলিভিশন নিজেরা অনুষ্ঠান খুব কম বানায় বাজার থেকে প্রকিউর করেই চ্যানেল চালায়। আর আমরা প্রকিউর কম করবো নিজেরা বানাবো বেশী…। – থামো থামো! আর বলতে হবেনা, বলে তিনি আমাকে থামিয়ে দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ্‌ বুঝা যাচ্ছে তোমরা নিজেদের একটা পৃথক আইডেন্টিটি নিয়ে আসতে চাচ্ছো। এটা বিরাট সাহসের ব্যাপার। দোয়া করি তোমরা যাতে সফল হও। কিন্তু এবার আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি শোন, তোমরা যেভাবে মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত থেকে সংস্কার বা পরিবর্তনের কাজ করতে চাচ্ছো এটা রাসুল(সঃ)এরও কর্মপন্থা ছিল। রাসুল(সঃ) নিজেও মূলধারায় সম্পৃক্ত ছিলেন। এটা তাঁর সুন্নাহ। নবুওাতের পূর্বে ৪০ বছর তিনি জাহেলী সমাজের মধ্যেই বিচরন করেছেন। তিনি সমাজ থেকে আইসোলোটেড(বিচ্ছিন্ন) ছিলেননা। সেজন্য কুফরি সমাজই তাঁকে আল-আমীন, আস- সাদিক উপাধি দিয়েছিল। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ১৩ বছর তিনি সেই জাহেলী সমাজে থেকেই তাদের সংশোধনের কাজ করেছেন। তাঁর জীবন শংকায় নিপতিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি মক্কা ছেড়ে যাননাই। কিন্তু কথা হল তৎকালীন সমাজের মধ্যে শক্তিশালী ভাবে থেকেও সমাজের সব খারাপী বা পংকিলতা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। তিনি তাদের মধ্যে থেকেই কাজ করেছেন কিন্তু তিনি এবং তাঁর সাথীরা ছিল সকল জাহেলিয়াত থেকে মুক্ত।
হুজুর একটু গলা পরিস্কার করে বললেন, কিন্তু তোমরা যে মূলধারায় কাজ করার চিন্তা করছো সেখানে তো তোমরা সেই জাহেলিয়াতকে ধারন বা স্পর্শ করেই করতে চাচ্ছো? রাসুল(সঃ)এর কর্মকৌশল এর সাথে এখানেই তোমাদের পার্থক্য। শ্রদ্ধেয় মাওলানার ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্ন সবার মধ্যে চিন্তার ঢেউ খেলে দেয়। তিনি কী বুঝাতে চাইছেন সবার কাছে তা পরিষ্কার! আলোচনার কঠিন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। কারও কোন কথা নেই।

আমতা আমতা করে বললাম, আমি কী একটু কথা বলতে পারি?
সবাই মাথা নেড়ে সাঁয় দিল। আমার গলা কাঁপছিল। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, মক্কী জীবনে রাসুল (সঃ) যখন তাদের মাঝে মিলে মিশে সমাজ পরিবর্তনের কাজ শুরু করলেন হালাল, হারাম, জায়েজ, নাজায়েজ এসকল বিধান কী তখন জারী হয়েছিল? আমরা যে বলছি তাঁকে বা তাঁর সাথীদের পংকিলতা স্পর্শ করেনি, এই পংকিলতা মানে কী? এই পংকিলতা মানে কী হালাল, হারাম?একজন বললেন, এই পংকিলতা মানে পাপ বা অন্যায়, যা সেই জাহেলী সমাজেও মূল্যায়ন করা হত।
– কিন্তু এখন আমরাতো পাপ-পুণ্য বা ন্যায় অন্যায় কে বিবেচনায় আনছিনা। আনছি হালাল হারাম কে।
-মানে?
– ধরুন ঢাকার কোন রাস্তায় কিংবা মক্কা শহরের কোন এভেনিউতে কলেজগামী একটি ছাত্রী রোড এক্সিডেন্ট করলো, পাশে একজন ইয়াং পুলিস সার্জেন্ট কর্তব্যরত ছিল সে দৌড়ে এসে অন্যদের সহযোগিতায় ধরাধরি করে মেয়েটিকে এ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। আমাদের প্রচলিত সেকুলার সোসাইটি বা রাসুল (সঃ) এর তৎকালীন জাহেলী সমাজের দৃষ্টিতে এই কাজটি একটি জনহিতকর কাজ, উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু শরিয়ার দৃষ্টিতে ঘটনাটার বিশ্লেষণ কী হবে? প্রশ্ন আসবে বেগানা একটি পুরুষ বেগানা একজন নারীকে এভাবে সহযোগিতা করা জায়েজ হয়েছে কি না? আমরা যদি এই ঘটনাটিকে ভিজুয়ালি দৃশ্যায়ন করতে চাই তাহলে প্রশ্ন আসবে বেগানা একটি মেয়ে এবং বেগানা একটি পুরুষের সাথে এই অভিনয় করানো শরিয়াত সম্মত
হয়েছে কিনা?…।—(অসমাপ্ত ……চলবে)
#মুখোশের_বয়ান_সপ্তম…… (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়–)

জোশের বশে অনেক্ষণ কথা বলে আমি একটু থামলাম। দেখলাম সবাই আমার দিকে চেয়ে আছে। একটু লজ্জিত হলাম। লজ্জা ঝেড়ে আবার শুরু করলাম,
– বেয়াদবী হলে ক্ষমা করবেন। আমি আপনাদের ছাত্র হওয়ারও যোগ্য নই। খোলামেলা কথা বলে মনের কিছু খটকা দূর করতে চাই।
তাঁরা বললেন অসুবিধা নাই বলো-
– আমাদের প্রিয়নবী রাসুল(সঃ)কী একসাথে শরিয়াহ’র বিধি বিধান নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন?
– না হন নাই।
– আমি যতটুকু জানি তিনি নিজে থেকে পথ বের করার চেষ্টা করেছিলেন। চিন্তা জগতে তাঁর আলোড়ন উঠেছিল।
তিনি দিনের পর দিন ভেবেছেন। পথ খোঁজার চেষ্টা করেছেন। নিজ চিন্তা থেকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপও নিয়েছেন। নবূওয়াত প্রাপ্তির পর তাঁর সমাজ পরিবর্তনের কাজ ও দায়িত্ব বেড়ে যায়। কাজ করতে করতে তাঁর পথ খোলাসা হয় এবং ধীরে ধীরে নানা চড়াই উৎরাই ও একটি বিপ্লবের পথ পরিক্রমায় শরিয়াহ’র বিধানও তাঁকে দেয়া হয়। এভাবে একদিকে একটি ইসলামী সমাজ এবং কল্যাণকর বিধিবিধান পূর্ণতা লাভ করে।

আমার কথা থামিয়ে মদীনা থেকে পাশ করা বিশেষজ্ঞ বললেন, এসব কথাতো আমরা জানি, ঠিক আছে। কিন্তু আপনি এসব না বলে মূলকথা কী সেটা বলেন। আমি বললাম, আমার কথা হলো রাসুল (সঃ) মূলধারায় কাজ করেছেন, তিনি আলাদা করে কোন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেননি। মূলধারায় থেকে মূলকে সংশোধন করেছেন তিনি। সেক্ষেত্রে তাঁর নীতি ছিল ন্যায়-অন্যায়, শ্লীল-অশ্লীল, সত্য-মিথ্যা, কল্যাণ- অকল্যাণ মেনে চলা, ইসলামী শরিয়াত নয়। ফলে সে সময়ে পর্দা, গান, বাজনা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক রসম রেওয়াজ নিয়ে কোন কথা উঠেনি। এমনকি ক্বাবা ঘর থেকে মূর্তি অপসারণের চিন্তাও করা হয়নি, সে অবস্থায় তিনি ক্বাবা তাওয়াফ করেছেন। শরিয়াহ কায়েম হয়েছে সমাজে ইসলামাইজেশনের পরে। আমি মনেকরি শরিয়াহ’র ইমপ্লিকেশন প্রাথমিক স্তরে নয়, চূড়ান্ত স্তরে এবং সেটা ধীরে ধীরে।
চোরের হাত কাটা শরিয়াহ আইনের একটি বিধান কিন্তু সমাজে যদি খাদ্যের অভাব থাকে তাহলে সে আইন কী কার্যকর থাকবে? থাকবেনা, সেটা স্থগিত থাকবে। তেমনি ভাবে সমাজের অধিকাংশ লোক যদি হয় ইসলামী চেতনার পরিপন্থী, সেখানে আমরা যদি প্রথমে শরিয়াহ কে সামনে আনি তাহলে চিন্তাটা কী ইসলাম সম্মত হবে? বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র নয় এটা একটা সেকুলার রাষ্ট্র। এর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আইয়ামে জাহেলিয়াতের চাইতেও খারাপ অবস্থানে আছে। সে অবস্থায় আমরা ইসলামী শরিয়াহ নয় বরং ন্যায়-অন্যায়, শ্লীল-অশ্লীল, সত্য-মিথ্যা, কল্যাণ-অকল্যাণ মেনে মূলধারার একটা টিভি স্টেশন অপারেট করতে চাচ্ছি। আমরা যদি এই অপসংস্কৃতির ধারায় দাঁড়িয়ে একটি ক্ষুদ্র ইতিবাচক পথ তৈরি করতে পারি সে পথ ধরে ধীরে ধীরে আরও শালীন, শ্লীল, কল্যাণকর স্পৃহা তৈরি করবে।
ক্রমান্বয়ে মানুষের মনোজগৎ বদলাবে। সত্য ও ইতিবাচক পথের অনেক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, কলাকুশলী তৈরি হবে। নিকট ভবিষ্যতে যে কল্যাণকর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠিত হবে সেখানে একটি শরিয়াহ ভিত্তিক সাংস্কৃতিক জগত বা মিডিয়া তৈরি সহজতর হবে। ব্যাস আমার কথা শেষ।
বরিষ্ঠ আলেম মুরুব্বি এতক্ষণ হাল্কা চোখ বুজে কথা শুনছিলেন। চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- তুমি কী মাদ্রাসায় পড়েছ?
– না সেই সৌভাগ্য হয়নি আমার।
– মা’শাআল্লাহ! ভালোই বলেছো, তোমার বিশ্লেষণ খুব ভাল লেগেছে। তিনি এবার হানিফ ভাই এবং মাহবুব ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমাদের কাছ থেকে আপনারা ফতওয়া চাননা, পথ নির্দেশিকা চান। আমিতো দেখছি এ সংক্রান্ত গবেষনায় আপনারা অনেক অগ্রসর।

আপনাদের সার্বিক কথায় যেটা বুঝলাম সেটা হলো-
আপনারা একটা শালীন, অশ্লীলতা মুক্ত মূলধারার টেলিভিশন করতে চান। কিন্তু মূলধারা বলতে যে জায়গাটা সেটা ময়লা আবর্জনায় ভর্তি। সেটার উপরদিয়ে কীভাবে চলবেন সেটা হলো প্রশ্ন? আপনাদের প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে আপনার ঘর থেকে মসজিদে যাওয়ার যে একমাত্র রাস্তা সেটার মধ্যে নানা নাপাকী ছড়ানো ছিটানো আছে। তার উপর দিয়ে হেটে গেলে কাপড় বা অজু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এখন আজান শোনার পর আপনি মসজিদে গিয়ে নামাজ কায়েম করবেন না ঘরে বসে একা নামাজ পড়বেন? উসুলের নীতি হলো আপনাকে সেই নাপাকীর উপর দিয়েই মসজিদে যেতে হবে তবে খুব সাবধানে। যথাসম্ভব কাপড় এবং শরীর রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে।
তারপরও কাপড় এবং শরীরে যদি কোন নাপাকী লাগে তাহলে মসজিদে প্রবেশের আগে ধুয়ে পাক-সাফ হয়ে মসজিদে ঢুকে নামাজ কায়েম করতে হবে।
তাঁর কথার সাথে সুর মিলিয়ে মাদানী বিশেষজ্ঞ বললেন। বাংলাদেশে যে সকল ইসলামী সংগঠন রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করছে তাদের কর্মকৌশলও তো আপনাদের মত। তারাও তো মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মিলে মিশে রাজনীতি করছে। রাজনীতির ময়দান তো আরও বেশী অনৈসলামিক। মিছিল, স্লোগান, মারামারি, কাটাকাটি, হরতাল, ইলেকশন, পদ ভাগাভাগি, কোন্দল ইত্যাদি। চিন্তাশীল আলেমরা যখন এই প্রচলিত রাজনীতিতে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন অনেকে বলেছেন এই রাজনীতি শরিয়াহ সম্মত নয়। এই রাজনীতি কুফরী। কিন্তু আজ প্রায় সকল ওলামারাই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। মূলধারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আন্দোলন, সংগ্রাম, হরতাল, মানব-বন্ধন, অবরোধ, ভোট, সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা এগুলো জায়েজ কী নাজায়েজ তা নিয়ে বিতর্ক কিন্তু কম নাই। তবে আমি মনেকরি তাঁরা একটা সমস্যা করেছেন, সেটা হল তাঁরা ইসলামী নামে দল খুলেছেন। ফলে তাদেরকে সবসময় জায়েজ-না জায়েজের প্রশ্ন বানে জর্জরিত হতে হয়। তাঁরা যেসব কর্মকাণ্ড করছেন সেটা ইসলামের সাথে যায় কিনা তা পাবলিক সবসময় মনিটর করে।
কিন্তু আপনারাতো ইসলামী নামে চ্যানেল খুলছেন না। ইসলামী সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথাও বলছেন না। আপনারা বলছেন সত্য ও সুন্দরের পথে চলার কথা। আমি মনেকরি কৌশলগত পথ হিসেবে আপনাদের চিন্তা সঠিক এবং যথার্থ। এবার আর কেউ কথা বললেন না সবাই মিলে একমত হলেন।
মুরুব্বী আলেম বললেন, আমরা কিছু পরামর্শ দিতে পারি- যদি আপনারা মেনে চলেন। আমরা সমস্বরে বললাম অবশ্যই।

তাঁরা সবাই মিলে কিছু গাইড লাইন দিলেন–
১) আপনারা মূলধারার টেলিভিশন হিসেবে আত্ম-প্রকাশ করবেন ঠিক আছে কিন্তু অশ্লীল, উৎকট, অতিরঞ্জিত, কৃত্রিম, বিতর্কিত বিষয়াদি পরিহার করার চেষ্টা করবেন।
আপনাদের টেলিভিশনের ইমেজ যেন হয় শালীন ও মার্জিত।
২) হালাল-হারাম, জায়েজ-নাজায়েজ, উচিত-অনুচিত বিতর্কে আপনারা জড়াবেননা। সমলোচনার জবাব মুখে নয় নিজেদের কাজ দিয়ে আপনারা দেয়ার চেষ্টা করবেন।
৩) যত গালি গালাজ বা কুৎসা রটানো হোকনা কেন আপনারা ধৈর্যশীলতার নীতি অবলম্বন করবেন।
৪) এটা আপনাদের কৌশলগত পথচলা। সতর্কতার সাথে পথ চলতে হবে। মূল লক্ষ্য ও নিয়ত অর্জনের বাসনা সবসময় মাথায় রাখতে হবে।
৫) বাজারের কলাকুশলী বা অনুষ্ঠানের উপর আপনারা নির্ভরশীল হবেননা, ক্রমান্বয়ে তা কমিয়ে নিজেদের তৈরি জনবল ও নিজস্ব চিন্তার অনুষ্ঠান তৈরি করার চেষ্টা করবেন।
শ্রদ্ধেয় আলেমদের মতামত, মূল্যবান পরামর্শ পেয়ে বুকটা বেশ হাল্কা হয়ে যায়। মাথার উপর থেকে একটা বড় বোঝা যেন সরে আসে। চলার পথের গতিটা এবার বাড়বে ইনশাআল্লাহ্‌। খুশী মনে একে একে সবাইকে বিদায় দিলাম। যাওয়ার সময় মুরুব্বী আলেম একান্তে আমাকে কাছে ডাকলেন। খুব স্নেহ ভরে মাথা ও কাঁধে হাত রাখলেন। আস্তে করে বললেন, তোমার এখন সাংগঠনিক দায়িত্ব কী?
– আমি বললাম, কেন?
– খুব কঠিন কাজে তোমরা হাত দিয়েছ। তোমার সাংগঠনিক পরিচয় এবং দায়িত্ব এই কাজের সাথে কনফ্লিকট তৈরি করবে।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম, আমার কী তাহলে ঊর্ধ্বতন মুরুব্বীদের সাথে কথা বলে অনুমতি নেয়া দরকার আছে?
– হ্যাঁ তুমি কথা বল, তবে অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
আমি তাঁর কথার শানে নুজুল বুঝতে পারলাম না। তিনি হাত মিলিয়ে গাড়ীতে উঠে গেলেন। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাঁর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে থকলাম…।
(অসমাপ্ত…… চলবে)
#মুখোশের_বয়ান_অষ্টম……… (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়…)

একে একে সবাই চলে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। কখনো কখনো একা হওয়া খুব কষ্টের। এই কয়দিন অনেক কথা বললাম, অনেক কথা শুনলাম। কিন্তু এখন আমার সামনে আমি। চিন্তা ও বিবেকের টানাপড়েনে নিজেই প্রশ্নকারী, নিজেই উত্তরদাতা।
আনমনে নিজেকেই আমি প্রশ্ন করি-
আচ্ছা মিঃ এক্স সিপি তোমার কী এ রকম একটা দায়িত্ব নেয়া ঠিক হবে? যাকে তুমি এতদিন অপসংস্কৃতি বলে প্রত্যাখ্যান করেছ, নিষিদ্ধ ইলিমেন্ট হিসেবে বিবেচনা করেছ। বক্তব্য, আলোচনা, দলিল, দস্তাবেজ দিয়ে এ থেকে বিরত থাকার জন্য জনশক্তিকে পাঠ দিয়েছো। প্রফেশনাল রেস্পন্সিবিলিটির কথা বলে তুমি এখন ‘মিউজিক শো’ ‘ড্রামা’ ‘মুভি’ এসবের প্ল্যানিং করবে! বাজেট অনুমোদন করবে! ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে এসব
প্রোগ্রাম প্রিভিউ করবে! এগুলোর অফিসিয়াল রিভিউ লিখে নিজের মতামত জানাবে! অন-এয়ারের জন্য ছাড়পত্র দেবে!

এ দায়িত্ব কী তোমার সাথে মানানসই? জেনে শুনে শরিয়াহর সীমালঙ্ঘন মুলক কাজে তুমি নিজেকে সম্পৃক্ত করবে? তোমার এতদিনের সম্মান, মানুষের আকাংখা, তোমার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের কী কোন মূল্য নেই? যারা তোমাকে অনুসরণ করে, তোমাকে দেখে, তোমার কথা শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে আদর্শের পথে এসেছে তারা কী হতাশ হবেনা? এসকল অনুষ্ঠান দেখে যাদের পাপ হবে তুমি কী তার দায়ভার এড়াতে পারবে? সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে, সাংস্কৃতিক অঙ্গন কে ক্রমান্বয়ে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এরকম একটা টিভি স্টেশন খুবই দরকারী কিন্তু তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্রিয় দায়িত্বে তোমাকে থকতে হবে কেন?

আপন প্রশ্নবানে কুপোকাত আমি। নিজের কাছেই তো কোন সদুত্তর নাই! আমিতো নিজেকেই কনভিন্স করতে পারছিনা, চরম অস্বস্তি আমার পুরো অন্তরকে আচ্ছন্ন করে….. । হঠাৎ পেছনে কারও হাতের স্পর্শে চমকে উঠি! একেএম হানিফ ভাই কখন যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাইনি। পীঠে সস্নেহে চাপড় দিয়ে বললেন,
– কী ভাবছো নেতা?
আমার চোখ পানিতে টলমলো। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিলাম।
– না কিছু না। মিটিং এর আলোচনায় একটা এজেন্ডা বাদ পড়ে গেছে।
– কী?
– আমরা যারা এখানে কাজ করবো বা করছি, তাদের বিষয়ে কোন আলোচনা হয়নি।
– আমাদের বিষয় নয় বলো তোমার বিষয়ে। আমাদের সারাজীবন তো আমরা মিডিয়ায় কাটিয়ে দিলাম। অনেক গালি শুনেছি। ফতোয়ার সম্মুক্ষীণ হয়েছি।

সেটা আশির দশক, টিভি দেখা ঘরে টিভি রাখা ছিল হারাম। আমার এলাকার জামে মসজিদে আমাকে মুরতাদ ও ঘোষণা করা হয়েছিল বিটিভি তে চাকুরী করার কারণে। পরে ডিজি হিসেবে যখন আমার প্রমোশন হয় তখন সেই মসজিদের খতিব একদিন আমার মোহাম্মদপুরের বাসায় এসে হাজির। যেভাবে হোক বিটিভি-র ইসলামী অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে যেন তাঁর নামটা এনলিস্টেড করিয়ে দিই। এখন আমাকে মসজিদ কমিটির সভাপতি বানানোর জন্য সবাই তোড়জোড় করছে। সুতরাং এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেঁড়ে ফেল। কিছু প্রশ্ন এবং খটকা কাজ করতে করতে সময়ের ব্যবধানে সলভ্ হবে।
– হানিফ ভাই বিষয়টা শুধু আমার সাথে রিলেইটেড নয়। আমাদের শতাধিক রিপোর্টার, প্রডিউসার, ক্যামেরাম্যান, এডিটর আছে যারা অনেকেই ইসলামী জীবন নীতি, হালাল-হারাম মেনে জীবন যাপনে অভ্যস্থ। তাদেরকেও একই রকম পরিস্থিতি ফেইস করতে হবে। হাজার হাজার ভাই বোনেরা নিজেদের রক্ত-ঘাম ঝরা অর্থের যোগান দিয়ে এই টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন শুধুমাত্র সওয়াবের আশায়। হানিফ ভাই আমার কথা পাত্তাই দিলেন না। হাহ্ হাহ্ করে হাসলেন। বললেন, তুমি অযথা এসব ফালতু ভাবনা ভাবছো। আমিতো মাওলানা না তবুও একটা ফতোয়া দিই শোন- তোমার এখানে পজিশন হলো ডিইডি। তুমি একটা ক্ষুদ্র টেলিভিশন চ্যানেলের তিন নম্বর ব্যক্তি। কিন্তু তোমার নেতারা ছিল মন্ত্রী, এক একটা মন্ত্রনালয়ের এক নম্বর ব্যক্তি। তাঁরা যদি একটা অনৈসলামিক সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারে। গণতন্ত্র, সেকুলারিজম হাবিজািবি রক্ষা করার শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের মন্ত্রী হতে পারে তুমিতো সেই রাষ্ট্রের অধীনস্থ একটা দুই ইঞ্চি জায়গার আধা ইঞ্চি কর্মকর্তা মাত্র। তুমিতো কোন শপথও নিচ্ছনা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন, এফডিসি, বিটিভি-র বাৎসরিক বজেট, দেশে যত ধরনের রবীন্দ্র, নজরুল, ফোক, আধুনিক, নৃত্যকলা আরো কত আগরম-বাগরম বাজেট আছে এগুলোর পিছনে যে শত শত কোটি টাকার সরকারী অনুদান- এগুলো মন্ত্রী পরিষদে পাশ হয়নি? এসব বাজেট পাশে উনাদের সম্মতি স্বাক্ষর লাগেনি? তাহলে উনাদের এসব কাজে অংশ নেয়া ভূমিকা রাখা কী অনৈসলামিক হয়েছে না বেশরিয়াতি হয়েছে?
আমি মনেকরি উনারা কারেক্ট কাজটাই করেছেন এটাকে মুভমেন্টের কৌশলগত পার্ট হিসেবে নিয়েছেন। উনারা যদি মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব না নিতেন সেই পদগুলি কী খালি থাকতো? হয়তো সেখানে অন্য দুইটা দূর্নীতিবাজ লোক মন্ত্রী হতো। এখন যে শত্রু মিত্র সবাই স্বীকার করে তাঁদের মন্ত্রনালয় ছিল দূর্নীতিমুক্ত, তাঁরা মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব কাঁধে না নিলে সেই এচিভমেন্ট এবং এপ্রিসিয়েশন কী তোমরা পেতে? সুতরাং দৃষ্টিকে বড় কর। কোরআন, হাদীস এবং ইসলাম কে বাস্তবতার বিশ্লেষণাত্মক চোখ দিয়ে বুঝতে চেষ্টা কর। হানিফ ভাইয়ের কথাগুলো আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা মানসিক সাপোর্ট দিলেও মনের মধ্যে আরও ভাবনার বিস্তৃতি তৈরী করে দিল ।

তিনি মুখে দুষ্টুমি হাসি টেনে বললেন, কী! ফতোয়া কেমন দিলাম? কৃত্রিম ভাব নিয়ে আমি সাথে সাথে বললাম আপনার এটা কোন ফতওয়া হলো! এসব গোজামিল ফতোয়ায় কাজ হবেনা। তিনি বললেন গোঁজামিল না, আমার কাছে দারুণ দারুণ ডকুমেন্টরী এভিডেন্স আছে, তোমাকে দেখাবো।
– কী এভিডেন্স?
উনি বললেন আপাততঃ একটা মুখে শোনাই। পরে একদিন ভিডিও ফুটেজ দেখাবো।
– কী সেটা?
জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ টেলিভিশনের আর্কাইভ উদ্ভোধন উপলক্ষে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করি আমরা। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন, সিনিয়র মন্ত্রীরাসহ ভিভিআইপিরা সবাই আমন্ত্রিত। বুঝতেই পারছো সাজ সাজ রব। রুনা, সাবিনা, কিশোর সহ সিনিয়র শিল্পীরা এ উপলক্ষে মঞ্চে লাইভ গান গাইবেন। মজার ব্যপার হলো রুনা লায়লা যখন দেশের গান গাইছিলেন তখন দেখা গেলো অনলাইন এডিটর ক্লোজে একবার রুনা কে পরের শটে ক্লোজে তথ্যমন্ত্রীর পাশে বসা শিল্পমন্ত্রীকে ধরছে। এটা নিয়ে বিটিভি তে খুব আলোচনা হল। কেউ কেউ টিপ্পনী কেটে সেদিন আমাকে বলেছিলেন বিটিভির আজকের পারফর্মেন্স পুরোটাই হালাল!
হানিফ ভাইয়ের নির্দয় রসিকতায় মনটা খুব আহত হলো। বিরক্ত প্রকাশ করে আমি বলি আচ্ছা হানিফ ভাই আপনি কী আমাকে শান্তনা দিচ্ছেন না টিটকারী করছেন। তিনি বললেন এসব শুনতে তোমার কাছে এখন বিরক্ত লাগছে। হক প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হলে হককথা সহ্য করতে শিখতে হবে! যেদিন তুমিও আমাদের মত বিভ্রান্ত-শয়তান-গোমরাহ-মুরতাদ-পথভ্রষ্ট-এজেন্ট ইত্যাদি উপাধি পাবে সেদিন এসব ইতিহাস কাজে লাগবে। (অসমাপ্ত…. চলবে..)
#মুখোশের_বয়ান_নবম (পূর্ববর্তী অংশের ধারাবাহিকতায়…)

হানিফ ভাইয়ের মুখে ক্রমাগত বিষ উদ্গীরন হচ্ছে। তিনি বলেই চলেছেন,
– তোমাদের সমস্যা কী জানো! তুমি নিজে যখন সীমা ক্রস করো, নীতি আদর্শের সাথে কম্প্রোমাইজ করো তখন সেটা কোন না কোন যুক্তিতে এক্সেপটেবল বা জায়েজ। কিন্তু আরেকজনের কোন বিচ্যুতি বা স্খলন দেখলেই তুমি তাঁর উপর চড়াও হচ্ছো, তাকে নাজেহাল করে ছাড়ছো।
তাঁর প্রকৃত অবস্থা কী?
কেন সে এই অবস্থায় পতিত তা বিবেচনায় নিচ্ছনা। আচ্ছা তোমাদের বহু বড় বড় নেতাতো আছে ডাক্তার। সে যখন ছাত্র ছিল গাইনী বিষয়ে, স্ত্রী রোগ বিষয়ে সে কী পড়েনি? তাঁকে কী প্রাকটিকেলি এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হয়নি?
একজন ডেন্টিস্ট যখন কোন মহিলা রোগী দেখে তাঁকে সেই মহিলার মুখ, ঠোট স্পর্শ করতে হয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে নির্ঘাত তাঁর পর্দা লংঘন হয়। কিন্তু সেতো আসলে নারীর শরীর দেখেনা সে দেখে রোগীর শরীর। তোমাদের একজন এক্স সিপি আছে লন্ডনে থাকে সে আমার দেশী লোক। বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ। যেসব বৃটিশ মহিলারা তাঁর কাছে চক্ষু পরীক্ষা করতে আসে তাদের পোষাক-আশাকের অবস্থা কেমন থাকে? শরিয়াহর দৃষ্টিতে তাঁর কী পর্দা রক্ষা হয়? যতটুকু জানি সে খুব পপুলার ডাক্তার!
এখন তুমি যদি বল আমার দলের এক্স সিপি প্রতিদিন পর্দা লংঘন করে অতএব আমিও করবো তাহলে আমি বলবো তুমি একটা মস্ত বড় জাহেল।
বিটিভি তে আমাদেরকে সারাজীবন সেকুলারদের কাছে নিগৃহীত হতে হয়েছে। রাজাকার, মৌলবাদী, ধর্মান্ধ গালি শুনতে হয়েছে। মার খেতে খেতে, অপমানিত, অপদস্ত হতে হতে নিজেদের এক্সিজটেন্সের জন্য একসময় সেখানকার ইন্টারনাল পলিটিক্সে আমরা ইনভল্ব হই।
এর জন্য ভাব নিতে হয়েছে, অপসংস্কৃতির গুরুদের সাথে তাল মিলাতে হয়েছে। আমাদের জন্য তদবীর করার কেউ ছিলনা, কেউ চাকুরীও ম্যানেজ করে দেয়নি। কিন্তু ফতওয়া দেয়ার, দৃষ্টি আকর্ষণ করার লোকের মাশাআল্লাহ অভাব নাই। একদিন আমার শ্রদ্ধেয় সিনিয়র বড় ভাই ও দায়িত্বশীল- সাবেক এম,পি ও মন্ত্রীতো মুখের উপর বলেই বসলেন আমি যে স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছি তাতে আল্লাহ্‌র কাছে কী জবাব দিবো? আমার আয়, বেতন ইত্যাদি হালাল কিনা? আরও অনেক কথা।

আমার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞেস করি আপনার আয়ের উৎস কী? পার্টির দায়িত্ব পালন করে তার বিনিময়ে ভাতা নেয়া, বেতন নেয়া হালাল কিনা? কিন্তু কষ্ট পাবেন দেখে মুখের উপর বলিনি। খুব দূঃখ পেয়েছিলাম সেদিন। অপমানিত বোধ করেছিলাম। কিন্তু মজার ব্যপার কী জানো! আমি যখন ডিডিজি নিউজ হলাম তিনি সুপারিশ পাঠালেন তাঁর মেয়ে জামাই কে সংবাদ পাঠক হিসেবে এনলিস্ট করার জন্য। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সাথে দিনরাত তদবীর করে তাঁকে আমরা সংবাদ পাঠক হিসেবে ঢুকাই। প্রচুর সমলোচনা হয়। কারণ সে ছিল পরিচিত মুখ এবং কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক। আমাদের মুখ রক্ষা হয় কারণ সে ছিল সংবাদ পাঠক হিসেবে খুবই যোগ্য। অল্পদিনে নিউজ সেকশনের সবার সাথে তাঁর খুব ভাব হয়ে যায়। তাঁর মোলায়েম আচরণে সকলে মুগ্ধ হয়।আচ্ছা তুমি বল, সে যে সংবাদ পাঠ করেছে সেখানে কী সব সময় ঈদের নামাজ আর মিলাদ মাহফিলের খবর ছিল?
সেখানে খেলার খবর ছিল, দুর্গা পুজা, কালী পুজা এমনকি হয়তো বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার খবরও ছিল । স্ক্রিপ্টে যা লিখা ছিল তাঁকে তাই পড়তে হয়েছিল। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে সে যে খবর পড়ে সম্মানী পেয়েছে তাঁর সেই আয় কী হালাল ছিল ? তখন কেমন লাগবে?

কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশনে খবর পড়ে সে যে তাঁর যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছে। সেখানে তাঁর আচার আচরণে অন্যদের মধ্যে যে নৈতিক প্রভাব পড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর যে একটা স্বীকৃতি হয়েছে, এবং এটার কারণে সারাদেশে তাঁর যে একটা সেলিব্রেটি ইমেইজ তৈরি হয়েছে তাঁর সুফল কী আন্দোলন পায়নি? আমি যতটুকু জানি তাঁর হাত ধরে শত শত ছেলে মিডিয়ায় তাঁদের ক্যারিয়ার করেছে। তাঁর কণ্ঠে অর্থ সহ কোরআনের অডিও বাংলাদেশে বেস্ট সেলার এবং জনপ্রিয়। সে এখন জাতীয় মাণের একজন শিল্পী, অনেকের কাছে আইডল।
এর পেছনে তাঁর বিটিভি ক্যারিয়ারের অবদান কী কম? সমস্যা হলো কিছু কিছু লোক দুই চারটা কোরআনের আয়াত আর হাদীস শিখে, শানে নুযূল, প্রেক্ষাপট কিছু না বুঝে একচোখা দৃষ্টি নিয়ে দ্বীনের বিশারদ বনে যাচ্ছে, আর ঘৃণা ছড়াচ্ছে।

আমি হানিফ ভাইকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম।
– অনেক হয়েছে এবার থামেন। চলেন গাড়ীতে উঠি।
হানিফ ভাই থামলেন ঠিকই কিন্তু ফস করে আমার সামনেই একটা সিগারেট ধরালেন, যা তিনি কখনই সাধারনতঃ করেন না। আমি আর তাঁকে চটালাম না, চুপ চাপ হজম করে গেলাম। এভাবে চারিদিকের নানা ইনপুটে আমার মনের মধ্যকার অস্থিরতা কিছুটা কমতে থাকে। মন কিছুটা সুস্থির হবার পর যথারীতি সিপাহসালার কে সব কিছু জানানোর জন্য হাজির হই। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। তুমি ইস্তেখারা কর। এই পথে আসলে সব ছেড়েটেড়ে সুদৃঢ় ভাবে আসতে হবে। মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়া যাবেনা।
– সব ছেড়ে বলতে আপনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
– নেতাগীরি, শোয়িং, মিছিল, মিটিং, গরম গরম শ্লোগান, বক্তৃতা টিসি, T.S এ আলোচনা করে বেড়ানো! এসব!
আমি অবাক হয়ে বলি! এসব বাদ দিতে হবে?
– অবশ্যই। আমাকে দেখেছো কখনো মিছিলে?
– দেখেছি। আপনাকে অনেক গরম গরম ভাষণ দিতে দেখেছি।
– বাজে কথা বলোনা, বছরে ছয়মাসে দু-একবার দেখে থাকতে পারো। সেসব ধরতব্বের মধ্যে পরেনা। তাছাড়া আমার সাথে নিজেকে মিলাতে যেওনা। তোমার উপর যে দায়িত্ব, তুমি যদি মাঠে ময়দানে রাজনৈতিক ভাবে সম্পৃক্ত থাকো তাহলে তোমাকে সাংবাদিক বা মিডিয়া কর্মীরা এক্সেপ্ট করবেনা। তোমার লীডারশীপ তাঁদের কাছে আরোপিত হবে ন্যাচারাল হবেনা।

– তাহলে আমি এখন কী করবো? আমি কী উর্ধতন মুরুব্বিদের সাথে কথা বলবো?
– অবশ্যই বলবে। তুমি আপাততঃ বছর খানেকের জন্য সব ধরনের দায়িত্ব থেকে ছুটি চাও। খবরদার উনাদের কাছে আমার কথা ঘুনাক্ষরেও উল্লেখ করবেনা। বিষয়টা তোমার সিদ্ধান্ত ও তোমার।
– উনারা কী রাজী হবেন?
– সম্ভাবনা খুব কম। ফিল্ডের দায়িত্বশীলদের কাছে ফিল্ডের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাই বেশী। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একজন দায়িত্বশীলের চাইতে তাঁদের কাছে একজন জেলা আমীর বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অবস্থানে থাকলে আমিও হয়তো তাই ভাবতাম। একজন সিপি কে দুয়েক বছরের মধ্যে খুব সহজে জেলা আমীর করা যায়।তর তর করে সেই জেলা শক্তিশালী হয়ে যায়। সিলেট কে দেখ, কক্সবাজার কে দেখ।
মল্লিক ছিল বাগেরহাটের একটা ছোট্ট ইউনিটের সেক্রেটারি। তাঁকে যদি আমি জোর করে ঢাকা না আনতাম এতদিনে বড়জোর সে বাগেরহাট জেলা আমীর হতো। বাগেরহাট জেলা আমীর কে কয়জন চেনে? তুমি তাঁর নাম জানো?
– না জানিনা।
– মতিউর রহমান মল্লিক কে আজ সারা পৃথিবী চিনে।
– আমার জায়গায় আপনি মল্লিক ভাই কে সেট করলেন না কেন?
– সে তুমি বুঝবেনা। এখানেও একজন সিপি দরকার। যে ঝড়- সাইক্লোন এখানে আসবে তা মল্লিক সামলাতে পারবেনা। সিপি রা ঝড় সামলে সামলেই সিপি হয়।
কথাগুলো যে আমার ভালো লাগছিলো না তিনি বুঝতে পারলেন। নাটকীয় ভাবে হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ এর বর্ণিত একটা হাদীস বলতো দেখি? আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। খালিদ বিন ওয়ালিদ এর হাদিস! লজ্জিত হয়ে বললাম, না মনে পড়ছেনা।
– কেন মহাবীর খালিদ কী রাসুল (সঃ) এর নিবিড় সংস্পর্শে ছিলেন না?
– অবশ্যই ছিলেন। রাসুল (সঃ)-ই তো তাঁকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহ্‌র তরবারী) উপাধি দিয়েছিলেন।
– তাহলে সে রকম একজন বিখ্যাত সাহাবীর বর্ণিত কোন হাদীস নেই কেন?
– এটা কখনো ভেবে দেখিনি। হয়তো তাঁর বর্ণিত হাদিস আছে আমার জানা নাই, অথবা তিনি তেমন কোন হাদিস বর্ণনাই করেননি। অথবা তাঁর ব্যক্তিত্ব, স্মরণশক্তি ইত্যাদি বিবেচনা করে হাদিস সংগ্রহকারীগণ তাঁর হাদিস গ্রহণ করেননি।
– নো, তাঁর এক্সাপারটাইজ ছিল ওয়ার ফিল্ডে। হি ওয়াজ নট গ্রোউন আপ এস অ্যান ইনটেলেকচুয়াল বাট অ্যা সোলজার এন্ড আলসো দ্যা ফিল্ড মার্শাল। তিনি সাহিত্য বুঝতেন না, খুব ভালো বুঝতেন তরবারীর ভাষা।

আবু হোরায়রা কেন গ্রেট? সবচাইতে বেশী হাদিস বর্ণনার জন্য। তাহলে কী বোঝা গেল? আবার সেই পুরানো কথা সবার সব কাজের দরকার নাই। যে যার ফিল্ড নিয়ে মনোনিবেশ কর এবং বেস্ট এফোর্ট দেয়ার চেষ্টা কর। তাঁর শেষ কথায় আমার মাথা পরিস্কার হয়ে গেল। বুকের মধ্যে প্রচণ্ড কাঁপন শুরু হলো। এই কম্পন আমার খুব পরিচিত। জীবনে বহুবার আমি এরকম কম্পন অনুভব করেছি। অতিশয় ক্ষুদ্র আমার জীবন, তথাপী বড় বড় কিছু সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হয়েছিল। জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত!
বুক জুড়ে ছিল নিদারুণ ভয়, কাউকে বুঝতে দেইনি। সাহসের ভান করে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলাম শুধু। এই কম্পন জানান দিচ্ছে আমাকে এখন সিদ্ধান্ত ফাইনাল করতে হবে। শলা পরামর্শ, ভাবনা শেষ। নাউ সেন্স ইজ মেচিউড।

কম্পনের তরঙ্গ তাজা থাকতে থাকতেই উপস্থিত হলাম হৃদয়ের হেড কোয়ারটার মগবাজারে। শীর্ষজন মুরুব্বী এঙ্গেইজ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ একটি এপয়েন্টমেন্টে। আমাকে রেফার করা করা হল দৃঢ়চেতা প্রসন্নচিত্ত ফরিদপুরের কৃতি সন্তান এর কাছে। আমি খুব খুশী হলাম। একটি বিশেষ কারণে তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। কেন যেন একটু বেশী ফ্রী ছিলেন আমার সাথে। কিন্তু আজ আমি তাঁর মুখোমুখি অপ্রিয় বিষয় নিয়ে। তাঁর অভিজ্ঞ
চোখে আমি ধরা পড়ে গেলাম। আমার চেহারা দেখে বললেন তুমি কী চিন্তিত কোন বিষয়ে?
(অসমাপ্ত……… চলবে… এরপর শেষ কিস্তি)

#বিশেষ_দ্রষ্টব্য……!!
মুখোশের বয়ান নবম অংশে আমি বিটিভি-র সাবেক ডিজি, জনাব একেএম হানিফের রবাত দিয়ে লিখেছিঃ
“কিন্তু মজার ব্যপার কী জানো! আমি যখন ডিডিজি নিউজ হলাম তিনি সুপারিশ পাঠালেন তাঁর মেয়ে জামাই কে সংবাদ পাঠক হিসেবে এনলিস্ট করার জন্য। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সাথে দিনরাত তদবীর করে তাঁকে আমরা সংবাদ পাঠক হিসেবে ঢুকাই। প্রচুর সমলোচনা হয়। কারণ সে ছিল পরিচিত মুখ এবং কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক। আমাদের মুখ রক্ষা হয় কারণ সে ছিল সংবাদ পাঠক হিসেবে খুবই যোগ্য।

অল্পদিনে নিউজ সেকশনের সবার সাথে তাঁর খুব ভাব হয়ে যায়। তাঁর মোলায়েম আচরণে সকলে মুগ্ধ হয়। আচ্ছা তুমি বল, সে যে সংবাদ পাঠ করেছে সেখানে কী সব সময় ঈদের নামাজ আর মিলাদ মাহফিলের খবর ছিল? সেখানে খেলার খবর ছিল, দুর্গা পুজা, কালী পুজা এমনকি হয়তো বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার খবরও ছিল । স্ক্রিপ্টে যা লিখা ছিল তাঁকে তাই পড়তে হয়েছিল। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে সে যে খবর পড়ে সম্মানী পেয়েছে তাঁর সেই আয় কী হালাল ছিল ? টেলিভিশনে খবর পড়ে সে যে তাঁর যোগ্যতার সাক্ষর রেখেছে। সেখানে তাঁর আচার আচরণে অন্যদের মধ্যে যে নৈতিক প্রভাব পড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর যে একটা স্বীকৃতি হয়েছে, এবং এটার কারণে সারাদেশে তাঁর যে একটা সেলিব্রেটি ইমেইজ তৈরি হয়েছে তাঁর সুফল কী আন্দোলন পায়নি? আমি যতটুকু জানি তাঁর হাত ধরে শত শত ছেলে মিডিয়ায় তাঁদের ক্যারিয়ার করেছে। তাঁর কণ্ঠে অর্থ সহ কোরআনের অডিও বাংলাদেশে বেস্ট সেলার এবং জনপ্রিয়। সে এখন জাতীয় মাণের একজন শিল্পী, অনেকের কাছে আইডল। এর পেছনে তাঁর বিটিভি ক্যারিয়ারের অবদান কী কম? ”

#এই বয়ানের একটি বিশেষ অংশ সম্পর্কে বিটিভি-র এককালীন জনপ্রিয় সংবাদ পাঠক, বিশিষ্ট কণ্ঠ শিল্পী ও সুরকার শ্রদ্ধেয় সাইফুল্লাহ মানসূর কিছু সংশোধনী জানিয়েছেন।

পাঠকের সদয় অবগতির জন্য তা এখানে উল্লেখ করা হলোঃ
#জনাব সাইফুল্লাহ মানসূর বলেন:
“আমি বিটিভি তে নিউজ পড়া শুরু করি ১৯৯৫ সাল থেকে।তখন ডিডিজি নিউজ ছিলেন মরহুম ফারুক আলমগীর, সে সময় একেএম হানিফ ছিলেন নিউজ এডিটর। তার প্রায় ১০ বছর পর মরহুম জনাব হানিফ সাহেব ডিডিজি নিউজ হন।তাকে তদবির করে আমার সংবাদ পাঠক বিষয়ক টেলিভিশনে যুক্ত হওয়া সম্পূন’ ভুল তথ্য।মৃত ব্যক্তি সম্পকে’ যে কোন তথ্য দেয়ার আগে আরো যাছাই বাছাই করা জরুরী। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দিন।আমিন।

#একই প্রসঙ্গে জনাব নাজিব মোমেন লিখেছেনঃ
জামাই এর চাকরী: সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো হানিফ সাহেবের কাছে নাকি শহীদ আমীরে জামায়াত তার জামাই এর চাকরীর জন্য সুপারিশ করেছেন। আর তিনি তৎকালীন তথ্য মন্ত্রীর কাছে অনেক দেন দরবার করে চাকরী যোগাড় করে দিয়েছেন। ১মত মরহুম হানিফ সাহেবের পজিশন তখন বিটিভিতে কি ছিল তখন আর শহীদ আমীরে জামায়াতের পজিশনইবা কি ছিল? বড় ভাই বলেছেন হানিফ সাহেব ছিলেন বিটিভির ডিজি নিউজ, এটা ঠিক তথ্য নয় তিনি তখন একজন সাব এডিটর ছিলেন মাত্র। উনার উপরের আরও অনেক কর্মকর্তা, সহকারী সচিব, সচিব সবাইকে ডিঙ্গিয়ে তিনি মন্ত্রীর সাথে সরাসরি তদবীর করেছেন, এটা কি কোন ডেকোরামে পড়ে? শহীদ আমীরে জামায়াত তখন এম,পি এবং জামায়াতের সংসদীয় দলের নেতা। আমরা ১৯৯২/৯৩ সালের কথা বলছি যখন সদ্যই জামাতের সমর্থনে বি এন পি ক্ষমতায় এসেছে। সে সময় তথ্য মন্ত্রী ছিলেন নাজমুল হুদা। এখন এই ব্যাক্তির অবস্থান যাই হোক, এই ভদ্রলোক সেই সময় জামায়াতের সাথে ভালই সম্পর্ক রাখতেন, শহীদ আমীরে জামায়াতের সাথেও তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সংসদে তিনি অধ্যাপক গোলাম আজম সাহেবের নাগরিকত্ব নিয়ে অনেক ভাল ভাল কথা বলেছেন যার রেকর্ড এখনো খুজলে পাওয়া যাবে। শহীদ আমীরে জামায়াতকে করা তার অসংখ টেলফোন কল ছোটবেলায় আমি নিজেই রিসিভ করেছি।

সেই ব্যাক্তির কাছে তিনি বিটিভির একজন সাব এডিটরকে পাঠিয়েছেন নিজের জামাই এর চাকরীর সুপারিশ করতে? গাজাখুরী গল্পের একটা সীমা থাকা দরকার। উনার লেখাতেই প্রমান আছে সাইফুল্লাহ মানসুর জনপ্রিয় সংবাদ পাঠক ছিলেন। শহীদ আমীরে জামায়াতের জামাই হওয়ার আগে থেকেই তিনি রেডিওতে সংবাদ পড়তেন। উনার নিজের আম্মাও সেই সময় একজন এমপি ছিলেন। উনার বিএনপি আর আওয়ামী লীগে এত হাইপ্রোফাইলের আত্নীয় স্বজন আছেন যে, তদবীর করে সংবাদ পাঠক হতে চাইলে একজন নিম্নপদস্থ ডিজির দারস্থ হওয়ার তার কোন দরকার হতোনা। বরং ইতিহাস সাক্ষী, জামাই হওয়ার কারনেই অনেক ক্ষেত্রেই তাকে অবিচারের স্বীকার হতে হয়েছে। তদবীর আর শ্বশুরের জোরেই যদি উনাকে সংবাদ পাঠকের পদ পেতে হয়, আমাদের টিভি বলে কথিত এই বড় ভাইয়ের টিভি চ্যানেলে সাইফুল্লাহ মানসুর সংবাদ পাঠক হিসাবে কোন সুযোগ পেল না কেন? সেখানেও তো মরহুম হানিফ সাহেব বড় পোষ্ট হোল্ড করতেন বলে জানি। আলহামদুলিল্লাহ শশুরকেও কখন অন্যায় সুপারিশ করতে হয় নাই। জামাই এরও শশুরের সুপারিশের দরকার হয় নাই। সকল প্রশংসা আল্লাহরই।

প্রিয় পাঠক ও বন্ধুগণ,
জনাব একেএম হানিফের প্রদত্ত তথ্যের স্থলে জনাব সাইফুল্লাহ মানসূরের দেয়া তথ্য এবং নাজিব মোমেনের তথ্য কে পূণস্থাপিত ও সংশোধিত আকারে পড়ার জন্য আপনাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ রইলো।

দশম এবং শেষ পর্ব

#মুখোশের_বয়ান_দশম _(আপাততঃ শেষ)
‘একজন এক্স সিপি’র মৃত্যু!’
আমি যে চিন্তিত তা কীভাবে অস্বীকার করি! মনে মনে কী বলবো তা একটু গুছিয়ে নিলাম। আপনি ঠিকই ধরেছেন আমি চিন্তিত। শুধু চিন্তিত না কিছুটা সিদ্ধান্ত হীনতার চাপে আছি। সেজন্যই আপনার কাছে এসেছি। (মুখে হাসি টেনে) তাই নাকি! কী রকম চাপ? তাড়াতাড়ি বল আমার অন্য লোক কে সময় দেয়া আছে। আমি সবিস্তারে গুছিয়ে তাঁকে সব বললাম। সবশেষে বললাম, আমার আপাততঃ সংগঠনের দায়িত্ব থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি দরকার। আমার কথা শেষ হলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, এসব চিন্তা তোমার মাথায় কে ঢুকিয়েছে?
আমার সারা শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। কণ্ঠ কেন যেন ক্রমে জড়িয়ে আসছে, আমি নিরুত্তর।

জানি কে তোমাকে এসব মন্ত্র দিয়েছে। দিগন্ত একটা স্বতন্ত্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এটা আমাদের কোন কনসার্ন না। তোমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যপারে তোমরা স্বাধীন। যদি তোমরা আমাদের মত জানতে চাও, তাহলে বলবো তোমাদের এ সিদ্ধান্ত আমাদের পছন্দ হয়নাই। দিগন্ত আমাদের কোন প্রজেক্ট না যে সেখানে দায়িত্ব পালনের জন্য তোমাকে আমরা ছুটি দেবো। এটা তোমার চাকরী। অন্যান্য দায়িত্বশীলরা যেভাবে চাকরী করে সংগঠন করছে, তুমিও সেভাবে করবে। আমি ক্ষীণ স্বরে বললাম- এটাকে তো আমি চাকরী মনেকরিনা দায়িত্ব মনেকরি। তাছাড়া এখানকার কাজের ন্যাচার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
– ন্যাচার যে রকমই হোক, ছুটি গ্রান্টেড হবেনা।
আপনি আমার কথা গুলো একটু শুনুন, আমি আসলে খুব সমস্যায় আছি। আমি যদি ছুটি না পাই তাহলে টেলিভিশনের চাকরী ছেড়ে দেব।
– কেন? বিষয়টা নিয়ে তুমি এত সিরিয়াস কেন?
– আপনি বুঝতে পারছেন, আমাকে নাটক, গান-বাজনা, সিনেমা, এসব কিছু হ্যান্ডেল করতে হবে।পরিকল্পনা পাশ, বাজেট অনুমোদন, প্রিভিউ, রিভিউ, অন-এয়ার সব।
-খুব ভালো হইছে। তোমাদের মাথায় ঢুকছে তোমরা মেইনস্ট্রিম টিভি করবা,
ইসলামিক টিভি করবা না। সমস্যা তো হবেই, এখন সামলাও।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো দায়িত্ব যখন নিয়েছ এখন ছাড়া যাবেনা। তোমার বদলে ওখানে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলেতো আরো বরবাদ।
তুমি থাকলেতো কিছুটা কন্ট্রোল থাকবে।
– সেজন্যই তো বলেছি আমাকে একটু কিছু দিনের জন্য রুখসুদ দেন।
– নো, আমরা ভাবছিলাম তোমার দায়িত্ব আরও বাড়াবো উল্টা তুমি চাচ্ছো ছুটি।
কয়দিন পরে আমার বিরুদ্ধে যখন কমপ্লেইন আসবে তখন কী করবেন? তখন তো সোজা এক্সপেল্ড করে দেবেন।

– কমপ্লেন কেন আসবে? কমপ্লেন আসার মত কাজ করবা না, তাইলেই তো হলো।
শোন তুমি যদি সহীহ থাক তোমার নিয়ত যদি সহীহ থাকে কোন সমস্যা নাই। আমাদের স্মৃতিসৌধে যাওয়া নিয়ে কত সমলোচনা হলো। আরে আমরাতো রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের জন্য সেখানে গেলাম। আমরা কী সেখানে পুজা করতে গেছি! আমি মন্ত্রী থাকতে পুজা মন্ডপে বরাদ্দ দিতে হইছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার জন্য মন্ডপ পরিদর্শনে গেছি। এসব নিয়ে কত অপপ্রচার হইছে। কিন্তু আখেরে আল্লাহর রহমতে প্রমাণ হইছে আমরা দেশ-জাতির জন্যই কাজ করছি। ঐসব অপপ্রচার ধোপে টিকে নাই। বেগম জিয়ার সাথে জোটবদ্ধ আন্দোলন করায় আমাদের কত কুৎসিৎ ভাষায় সমলোচনা করা হইছে। এখন হক্কানী বড় বড় আলেম পীর মাশায়েখরাও স্বীকার করছেন দেশ এবং ইসলাম রক্ষার স্বার্থেই বৃহত্তর ঐক্যের দরকার। তাঁরাও এখন বেগম সাহেবের সাথে মিটিং করেন।
– কিন্তু আমার তো ভয় করছে।

আল্লাহ কে ভয় কর। নিজে নিজের কাছে পরিস্কার থাক। তোমরা বলছো তোমরা নতুন ধারা সৃষ্টি করবা। শালীন, সত্য সুন্দরের পক্ষে টেলিভিশন করবা। যদি ভালো কিছু করে দেখাতে পারো তবে সবাই তোমাদের বাহবা দিবে, স্বাগত জানাবে। ত্রুটি বিচ্চুতি কিছু হইলে ভুলে যাবে। আর যদি ফেইল কর কথা দিয়া কথা না রাখতে পার সম্মান এবং ইজ্জত সবটাই যাবে। আমি অসহায়ের মত হাত পা ছড়িয়ে বসে তাঁর কথা শুনছিলাম।
– সূরা নছর এর তফসীর পড় নাই? সেখানে কী বলছে- বিজয় আসলে সেখানে এস্তেগফারের কথা কেন বলছে? যুদ্ধের সময় টুকটাক ভুল হতে পারে বাড়াবাড়ি হতে পারে। সেসব কাজের জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হইছে। দিগন্ত আমাদের না এটা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই কথা বলে কী পার পাওয়া যাবে? আমাদের লোকেরাই তো এখানে বড় পরিমাণ টাকা ইনভেস্ট করছে। ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সভাপতি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এটার চেয়ারম্যান। আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। আমরাতো সাংগঠনিক ভাবে কাউকে ইনভেস্ট করতে বলি নাই। লোকেরা আমাদের কে জিজ্ঞেস করেও ইনভেস্ট করেনাই। আর নির্বাহী কমিটির সদস্যের পরিচালিত নিজস্ব ব্যবসার ব্যপারে কোন আপত্তি আসলে আমরা তখন সেটা সাংগঠনিক ভাবে দেখবো।

তাহলে আমার এখন করণীয় কী?
সেটা তুমি ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে নির্ধারণ কর। দায়িত্ব থেকে ছুটি নেয়ার চিন্তা মাথা থেকে ফেলে দাও। তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে, ফি আমানিল্লাহ। আমার কথা শেষ।
আমার কলিজাটা হুঁ হুঁ করে উঠলো। বুক ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে উঠছে কষ্টে। দায়িত্বশীলদের একজনের কাছে গিয়ে মনেহয় তাঁরটা ঠিক আরেকজনের কাছে গিয়ে মনেহয় না তিনি যা বলছেন এটাই ঠিক। হে আল্লাহ তুমি কেন আমাদের এত ছোট করে দুনিয়ায় পাঠালে। দায়িত্বশীলরা আমাদের এত ভালোবাসে। কোথায় আমাদের মা-বাবা! কোথায় আমাদের পরিবার পরিজন!নিজের জীবনের সিদ্ধান্তের জন্য আমরাতো মা-বাবার কাছে যাই নি কখনো! যখন মাত্র এসএসসি পাশ করে শপথ নিয়েছি, কুমিল্লা থেকে সোজা পাঠিয়ে দেয়া হলো চট্টগ্রামে। সংগঠনের সিদ্ধান্তে পলিটেকনিক ইন্সিটিউটে ইলেক্ট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হতে হয়েছিল। নিজের কোন চিন্তা করার সুযোগ ছিলনা। নিজকে নিয়ে চিন্তা করার দায়িত্বতো আমার না, সিদ্ধান্ত মানাটাই হলো দায়িত্ব। ছোট্ট তরুণ বয়সে কী কঠিন দায়িত্ব! সে অনেক কথা…।

পাঁচ সেমিস্টার পাশ করেও ডিপ্লোমা করা হলনা। হাত, পা, মাথা থেতলে দিয়ে একদিন ক্যাম্পাস ছাড়া করা হল। আমরা ঐতিহাসিক ৯ জন বহিষ্কার হলাম। স্থায়ীভাবে উদ্বাস্তু হয়ে যেতে হলো। ৮ জন দেশের বিভিন্ন ইনন্সিটিউটে ট্রান্সফার হয়ে পরবর্তীতে একসময় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীও করতে পারলো কিন্তু আমার ট্রান্সফারটাও হলোনা। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সাধ ঘোলের মধ্যে আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে গেল। একদিন সকালে হঠাৎ দায়িত্বশীল মোটর সাইকেলের পেছনে করে চট্টগ্রাম কলেজে নিয়ে গেলেন। শপথ পড়িয়ে দিয়ে বললেন এখন থেকে নতুন দায়িত্ব এখানে। এভাবে মোটর সাইকেলের পেছনে চড়তে চড়তে শহরের চান্দগাও থানা, এরপর একদিন জারুল গাছে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। কত রাত, কত দিন, স্বজনহীন কত ঈদ, কত স্মৃতি। আহা সাদা কাফনে জড়িয়ে প্রিয় ভাইগুলোকে বুক ভাঙ্গা বিলাপ করতে করতে কবরে নামিয়েছি।
ভাই হারা বোন কে, বার বার মূর্ছা যাওয়া মা জননীকে, বোবা বনে যাওয়া বাবাকে কে শান্তনা দিয়ে বলেছি, আমরা হৃদয়ে বিপ্লবের চাষ করেছি। বিপ্লব সফল করেই তোমাদের সন্তান কে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে আনবো। আমাদের নিজের কোন চিন্তা ছিলনা। আমরা পরীক্ষা দিব কী দিবনা, ফরম ফিলাপ করবো কী করবোনা সেই সিদ্ধান্তও ছিল দায়িত্বশীলদের কাছে। আমাদের জন্য ভাবনার একটা মেশিন ছিল- সেটা আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় সংগঠন। কিন্তু একি! আজ আমাকে ভাবতে হবে আমি কী করবো? আমি বলে যে আমার একটি জিনিষ আছে তাতো কখনো ভাবিনি।
মোটর সাইকেলে চড়িয়ে বিনা দ্বিধায় সংগঠনের ভাইদের জীবনের মোড় এক সময় আমাকেও ঘুরাতে হয়েছে। এখনও মনে পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শফিকুল ইসলাম মাসুদ কে উইথড্র করে কেন্দ্রে আনতে গিয়ে কী কান্নার রোল পড়েছিল সারা ক্যাম্পাসে। খড়খড়ি গ্রামে রাতে দাওয়াত ছিল ক্ষুদে শিল্পী মুজাহিদ ও বিপ্লবী কর্মী লালটু দের বাড়ীতে। মা, ভাই, বোন, ভাবী সবার কান্নার তোড়ে একসময় আমাকেও ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে হয়েছিল। ফরিদপুর শহর থেকে জহির উদ্দিন বাবর ভাইকে উইথড্র করে নিতে গেলাম বরিশালে। প্রথম বাঁধা দিলেন মুরুব্বীরা। কর্মী সমাবেশে কর্মীরা কাঁদতে কাঁদতে কয়েকজন বেহুঁশ হয়ে গেলেন।
মাসুদ আজ রাজশাহী কাল ঢাকায়, বাবর আজ ফরিদপুর কাল বরিশালে। এরকম হাজারো ভাইয়েরা ভাবতেও পারেনি কাল তাঁর দায়িত্ব কোথায়? কোথায় হবে তাঁর বসবাসের স্থান! কিন্তু আজ আমাকেই ভাবতে হবে আমি কী করবো!

কী নির্দয়ভাবে বাবা তাঁর তিলে তিলে জীবন শেষ করা পঙ্গু ছেলেটাকে বলতে পারে- সেটা তোমার ব্যাপার তোমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তুমি কী করবে?
আমার চোখে জলের বন্যা। অভিমানে আমি কুঁড়ে কুঁড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। মগবাজার থেকে লালমাটিয়া পর্যন্ত রিক্সায় আসতে আসতে আমার বুক ভেসে গেছে। রিক্সা ড্রাইভার বার বার পেছন ফিরে চাইছিল। কী হতো আমাকে ৬ মাসের জন্য ছুটি দিলে। আমি যেবার প্রথম কার্যকরী পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হই তখন প্রায় পুরো সময়টাই ছিলাম জেলে, শপথও নিতে পারিনি। পরিষদের শেষ অধিবেশনে আমার শপথ হয়। এই যে প্রায় এক বছর কোন কাজ করতে পারলাম না। সংগঠন কী থেমে ছিল?
আমার জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে হাসপাতালে। তখনতো আমি কোন কাজ করতে পারিনি! যে সকল দায়িত্বশীল বিদেশে পড়তে যায় তারাতো বছরের পর বছর ছুটি পায়। যারা বিশেষ নাজুক জায়গায় কাজ করে তাদেরতো কোন রিপোর্টের আওতায়ও আনা হয়না। এসব ভাবি আর আমার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আহা ছাত্র আন্দোলন আর মুরুব্বী আন্দোলনে কত পার্থক্য!

অভিমান ও কষ্টে একা একা গুমরে মরি। কয়েকদিন ধরে এস্তেখারা করি। একা একা নিজেকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করি। মনকে প্রবোধ দেই। দুই দায়িত্বশীলের কিছু কথা এস্তেখারায় কঠিন ভাবে রেখাপাত করে। “সবার সব দায়িত্ব নয়, যার যে যোগ্যতা তাঁকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে”।
“তুমি যদি সহীহ থাক তোমার নিয়ত যদি সহীহ থাকে কোন সমস্যা নাই”। “যদি ভালো কিছু করে দেখাতে পারো তবে সবাই তোমাদের বাহবা দিবে, স্বাগত জানাবে। ত্রুটি বিচ্চুতি কিছু হইলে ভুলে যাবে।”
জায়নামাজে গড়াগড়ি করে নিঃশব্দ ক্রন্দন নদী পেরিয়ে আমি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করি। জীবনে তিনবার শহীদ হওয়ার সুযোগ এসেছিল আমার। চূড়ান্ত ভাবে নিজেকে সঁপেও দিয়েছিলাম। তপ্ত লহুতে জমিনে শূলবিদ্ধ হয়েছি কিন্তু শাহাদাতের সৌভাগ্য হয়নি। আজ আবার অনেক ভেবে চিনতে মহান আল্লাহর সাথে ফায়সালা করে নতুন করে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিলাম।
এ কেমন মৃত্যু!
আমার নিজের অন্তরের কাছে আমি এই মৃত্যুর শিরোনাম দিয়েছিলাম “একজন এক্স সিপি’র মৃত্যু”।
হ্যাঁ প্রিয় ভাই ও বোনেরা আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার এক নাম্বার সিদ্ধান্ত ছিল আমি সেদিন থেকে নিজেকে নিজে পারতপক্ষে কোথাও এক্স সিপি হিসেবে পরিচয় দিবনা। সচেতন ভাবে আমার কোন বায়োডাটা, প্রোফাইল, কার্ড কিংবা সামাজিক পরিসরে এ পরিচয় আমি এভয়েড করার চেষ্টা করবো। কারণ আমি যে কাজ করতে চাচ্ছি তাঁর দায় একান্ত আমার। আমার ভুল, ত্রুটি, বিচ্যুতি আমারই। এই দায় আমার পবিত্র সংগঠনের নয়। আমার এক্স সিপি পরিচয়ের গায়ে আমি কোন কালিমা লাগাতে চাইনা। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখন থেকে কোন টিসি, টি,এস এ আমি আলোচনা করবোনা। কোন সমাবেশে বক্তব্য দেবনা। সবক্ষেত্রে লো প্রোফাইল মেনে চলব। তবে সেটা কাউকে আমি বুঝতে দিবনা।

আমি ধীরে ধীরে নিজেকে নেতা থেকে কর্মী পর্যায়ে নামিয়ে আনবো। এর জন্য আমি কোন ঘোষণা দেবনা। শুধুমাত্র দায়িত্বশীলেরাই বিষয়টা জানবেন এবং টের পাবেন। আমি দিগন্তে এবং মিডিয়া ক্ষেত্রে নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে নিয়োজিত করবো। এর যে প্রতিশ্রুতি তা অর্জন করাই আমার আপাততঃ লক্ষ্য। আমার সিদ্ধান্ত যেহেতু আমাকেই নিতে হবে তাই অবশেষে দুরু দুরু বুকে চ্যালেঞ্জ টা আমি নিলাম। আমি আমার সচেতন বন্ধুদের নিকট বিনীত ভাবে আরজ করবো। আপনারা লক্ষ্য করলে দেখবেন গত ৮-১০ বছরে মিডিয়া বা সেই সংক্রান্ত আলোচনা ছাড়া আমাকে আপনি কোথাও দেখেননি কিন্তু। ব্যানারের সামনে পেছনে, বক্তার ডায়াসে খুব একটা দেখেননি। ছাত্রদের অনেক টিসি, টিএস আমি বিনয়ের সাথে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছি। যেখানে পারিনি সেখানে মিডিয়া নিয়েই শুধু আলোচনা করেছি। আমি আপনাদের জ্ঞাতার্থে স্পষ্ট করে বলতে চাই। আমি নিজে মিডিয়ায় যে দায়িত্ব পালন করছি তা শরিয়াতের সাধারণ চোখে স্পষ্ট লঙ্ঘন। সেরকম পেশাগত কাজে
নিয়োজিত থেকে অন্যকে শরিয়াতের তালিম দেয়া, নীতিকথা শোনানো স্পষ্ট অসাধুতা বলে আমি মনে করি। অতএব আমার এই অবস্থান একান্ত আমার ব্যক্তিগত। কোন ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি তা আপনাদের এতগুলো পর্ব লিখে আশাকরি পরিষ্কার করেছি। ইত্যবসরে অনেকে আমাকে ভুল বুঝেছেন। আমার এই লো-প্রোফাইল, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া অনেকে পছন্দ করেননি। আমার ব্যক্তিগত কিছু বন্ধু আছে যারা অত সাংগঠনিক নিয়ম নীতি বোঝেন না, তাঁরা অনেক সময় হেয়ালী করে বলেছে আমি নাকি রাজনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়ছি। আমি এসকল তির্যক মন্তব্য সহজেই হজম করেছি এবং প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি।
কিন্তু এক্স সিপি পরিচয় চাইলেই কী মোছা যায়? আমি বললেই কী আমার কাজের দায় একান্ত আমার হবে সংগঠনের কাঁধে আসবেনা?
হ্যাঁ কথাটা সত্য। আমি চাইলেই এই পরিচয় মুছে যাবেনা, দায় মুক্তও হওয়া যাবেনা। কিন্তু আমার কী করনীয় আছে বলুন? আমাকেতো আমার কাছে পরিস্কার থাকতে হবে। রাসুল(সঃ) এর মানুষ হিসেবে সাধারণ কাজ কর্মে লোকেরা অবাক হতো! বলতো এ কেমন রাসূল! হাঁসে, প্রিয়জনের মৃত্যুতে কাঁদে, আঘাত পেলে ব্যথা পায়! ক্লান্ত হয়ে
ঘুমিয়ে পড়ে! সবার সাথে একসাথে বসে গল্প করে, রসিকতা করে!!!!
একজন এক্স সিপি হিসেবে আমার জীবনটাকে খুব রেসট্রিকটেড মনে হয়েছে। আমার ৭৫ বয়সোর্ধ্ব মাকে নিয়ে তাঁর অনুরোধে তাঁর সাথে আমার একটা ছবি পোস্ট করতে গেলেও আমাকে অনেক ভাবতে হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পাকিস্তান কে পরাজিত করায় আনন্দ প্রকাশ করে আমার দেয়া পোস্ট নিয়েতো মহা হুলুস্থুল। একজন সাধারণ মুসলমান যা করতে পারে আমি তা করতে গেলে প্রশ্ন সৃষ্টি হবে কেন? আমাকে সবসময় এক্স সিপির একটা কৃত্রিম মুখোশ পড়ে থাকতে হবে। আমার হাসি, কান্না, এক্সপ্রেশন অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে। সবসময় মাথায় রাখতে হবে আমাকে অন্যরা ফলো করছে। আমার প্রতিটি কথা, বার্তা, চাল-চলনে অন্যদের উপর প্রভাব পড়ছে। এই অন্য কারা? তাঁরা আমার মতই মানুষ। অর্থাৎ কথাটা অনেকটা এমন যে মহান আল্লাহ কে নয় আমার পরিচিত মানুষ গুলোকে ভয় করেই আমাকে চলতে হবে প্রতিনিয়ত। আমার কাছে এই কনসেপ্ট কে চরম মূর্খতা মনে হয়। আপনাদের আবেগ, সম্মান এবং সকল যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলছি আমি এই কৃত্রিমতা মানিনা।

এখন তাহলে আমাকে কী করতে হবে?
আপনারা হয়তো বলবেন, একটা পথ আছে আপনি নিজ থেকে ঘোষণা দিয়ে নিজেকে এই এক্স সিপির খোলস থেকে অবমুক্ত ঘোষণা করুন। কিন্তু বিশ্বাস করুন এটা আমি নিজেও অনেকবার ভেবেছি। এটা ভাবতে গেলে আমার হাত পা অসাড় হয়ে আসে। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে কান্না আসে।
এই আন্দোলনের জন্য আমি আমার পরিবার কে ছেড়েছি। আমার শরীরের প্রতিটি অনু পরমানুতে এই আন্দোলনের স্মৃতি গ্রন্থিত। জীবনে কোন স্বপ্ন বুনিনি, একটাই স্বপ্ন বুনেছি শুধু যার নাম বিপ্লব। আমি এই বিপ্লবের পথ ছেড়ে কোথায় যাবো?
কেবল আপনারাই পারেন আপনাদের হৃদয়তন্ত্রী থেকে আমাকে মুক্তি দিতে। আমার মত একজন এক্স কে ভুলে যান। স্মরণ থেকে মুছে ফেলুন। আমাকে এক্স সিপি হিসেবে গণ্য করবেননা। আপনাদের যাদের দৃষ্টিতে আমি গোমরাহ, ফেতনা সৃষ্টিকারী, এজেন্ট, বেয়াদব, অধঃপতিত, বিপথগামী এবং এরকম আরও অনেক কিছু। প্লিজ এর সব দায় একান্ত আমার ব্যক্তিগত। এই অধঃপতন ও দায় এক্স সিপি’র নয়।

আপনারা যারা আমাকে আগে দেখেননি, আমার সম্পর্কে জানেননা তাঁরা বিশ্বাস করুন আমি সারাজীবন এমনই ছিলাম। আমাকে যারা বহুদিন ধরে চেনে, যাদের আদরে শাসনে আমি সংগঠনে অগ্রসর হয়েছি তাদের কাছে জেনে দেখতে পারেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, পুরো চট্টগ্রাম শহর, বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো বাতাসে খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনারা এই বেয়াদব, বিপথগামী, মিথ্যাবাদী, অধঃপতিত আমাকে আজকের মতই পাবেন। আমার লেখা ১০ থেকে ১২ টি গানের মিউজিক ভিডিও হয়েছে। যেখানে জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীরা গান গেয়েছে এবং এগুলো টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়েছে। আমার লেখা ১৫ টির মত নাটক ও সিরিয়াল অনএয়ায় হয়েছে, যাতে জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীরা অভিনয় করেছে। আমি একজন ব্রডকাস্টার হিসেবে বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, ফক্স নিউজ হেড কোয়ার্টারে আমন্ত্রিত হয়ে ভিজিট করেছি। হলিউডের মুভি ফেয়ারে অংশ নিয়েছি। ব্রডকাস্ট ম্যানেজমেন্টের উপর বিবিসি তে ট্রেনিং করেছি। টেলিভিশনের প্রিভিউ কমিটির মেম্বার হিসেবে দেশী বিদেশী কয়েকশত ছবি প্রিভিউ করেছি এবং রিভিউ লিখে মতামত দিয়েছি। আমি এসব করেছি আমার প্রফেশনাল এসাইনমেন্ট হিসেবে। এগুলো কোন লুকানো ছাপানো বিষয় ছিলনা। কিন্তু আমার মুভি’র রিভিউ দেখে যারা অবাক হয়েছেন বলতে পারেন আমি উল্টো আপনাদের কথায় হতবাক হয়েছি!
আমি মিডিয়ায় কাজ কেন করি? এর ব্যাখ্যা, বুঝ, মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা একান্ত আমার। আমি এগুলো করেছি মানে এ নয় যে এগুলো আপনাদের জন্য জায়েজ ও হালাল। আমি করেছি বলে আপনাদেরও তা করতে হবে এটা জাহেলি ও অনেইস্লামিক যুক্তি। এক খেজুর গাছের বাকল ছিলে অন্য গাছে লাগানো সংক্রান্ত রাসুল (সঃ) এর একটি প্রসিদ্ধ হাদীস আছে তা পড়ে দেখবেন সেখানে কী বলা আছে। অনেকে বলেছেন আমি প্রফেশনাল কারণে এসব করেছি বা করি ঠিক আছে কিন্তু তা প্রকাশ করা উচিত হয়নি। প্রিয় বন্ধু এটা আপনার মত, তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমার জ্ঞানঃত এটা ভুল চিন্তা। মানুষ কী ভাববে, আমার কাজের প্রতিক্রিয়া মানুষের কাছে কী হবে এটা ভেবে নিজেকে আড়াল রাখা কে সম্ভবত শিরক বলে। আরেকটি কথা অনেকে মনে করেছেন আমি এখানে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে দিগন্ত টিভি’র কাহিনী কেন এনেছি? আসলে এখানে বলতে গেলে দিগন্ত প্রসঙ্গটি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আমার মূলধারার মিডিয়ায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার যে মানসিক দ্বিধা ও ইতিহাস এবং কেন আমি দেশে আলোচিত দুটি মুভি দেখলাম এবং তাঁর রিভিউ লিখলাম সেটা বোঝাতে আমাকে দীর্ঘ ঘাত প্রতিঘাত ও রুপান্তরের কথাটা বলতে হলো।
যারা কষ্ট করে আমার এতদিনকার এই বয়ান পড়েছেন, মতামত দিয়েছেন, নানা প্রশ্ন করে আমাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন- আপনাদের সবার প্রতি আমি অতিশয় কৃতজ্ঞ। আমার কথায় কোন কষ্ট পেলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আপনাদের জ্ঞাতার্থে শুধু এতটুকু বলি আমার একান্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শহীদ দায়িত্বশীল যে কয়টি কথা বলেছিলেনঃ “কমপ্লেন কেন আসবে? কমপ্লেন আসার মত কাজ করবা না, তাইলেই তো হলো।
শোন তুমি যদি সহীহ থাক তোমার নিয়ত যদি সহীহ থাকে কোন সমস্যা নাই। তোমরা বলছো তোমরা নতুন ধারা সৃষ্টি করবা।
শালীন, সত্য সুন্দরের পক্ষে টেলিভিশন করবা। যদি ভালো কিছু করে দেখাতে পারো তবে সবাই তোমাদের বাহবা দিবে, স্বাগত জানাবে”।
অত্যন্ত বিনীত ভাবে আপনাদের সদয় অবগতির জন্য বলছি এ পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে শ্রদ্ধাভাজন দের কাছে কোন কমপ্লেন আসেনি। আর আমরা আমাদের কর্মী কলা কুশলীরা সবাই মিলে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম কিনা, ভালো কিছু করে দেখাতে পেরেছিলাম কিনা তাঁর স্মৃতি ও ইতিহাস কখনো সময় সুযোগ পেলে লিখার আশা রাখি। আজ শুধু এতটুকু বলি দিগন্ত বন্ধ হওয়ার পর অগনিত মানুষের কাছে যতবার শুনেছি তাঁরা এরপর টিভি দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। ততবার বুকের মধ্যে দোলা অনুভব করেছি, যেই দোলার ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়- আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (সমাপ্ত)

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: