মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের ‘বিরোধিতায়’ ১১ জেলায় বাস চালানো বন্ধ  » «   নগরীতে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পিয়াজ, ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন  » «   বলিভিয়ার অশান্তির নেপথ্যে ‘সাদা সোনা’, যা পরবর্তী বিশ্বের আকাঙ্ক্ষিত বস্তু  » «   আবরার হত্যা: পলাতক চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি  » «   ‘অপকর্মে’ সংকুচিত দ. কোরিয়ার শ্রমবাজার  » «   ৩০০ টাকার পিয়াজ সরকারের দিনবদলের সনদ: ডাকসু ভিপি নুর  » «   অযোধ্যা রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করছে মুসলিমরা  » «   ভাঙছে শরিক দল সঙ্কটে ঐক্যফ্রন্ট  » «   হলি আর্টিসান হামলা: রায় ২৭ নভেম্বর  » «   চাকা ফেটেছে নভোএয়ারের, ভাগ্যগুণে বেঁচে গেলেন ৩৩ যাত্রী  » «   হাত-পা ছাড়াই মুখে ভর করে লিখে পিইসি দিচ্ছে লিতুন  » «   প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া বিএনপির চিঠিতে আবরার হত্যার বর্ণনা  » «   ১৫০ যাত্রী নিয়ে মাঝ আকাশে বিপাকে ভারতীয় বিমান, রক্ষা করল পাকিস্তান  » «   বিমান ছাড়াও ট্রেন, ট্রাক, বাসে করে আসছে পেঁয়াজ: সিলেটে পরিকল্পনামন্ত্রী  » «   চুক্তির তথ্য জানতে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিল বিএনপি  » «  

রাজন হত্যা : ‘খুনের দায় এড়াতে চুরির অপবাদ’



Rajon_sm_346995142নিউজ ডেস্ক: জীবন বাঁচাতে কপালের ঘাম মুখে দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টা চালায় রাজন। ঘাতকরা পানির বদলে ঘাম খেতে বলে। পাষণ্ড কামরুল হাতের লাঠি ড্রেনের পানিতে চুবিয়ে জোর করে তার মুখে ঢোকায়। তার মা-বোনকে নিয়ে অশ্লীল কথা বার্তা বলে নির্মমভাবে প্রহার করে।
নিষ্ঠুর নির্যাতনকারীরা রাজনের আর্তিতে অট্টহাসিতে মেতেছিলো। প্রাণ ভিক্ষা চেয়েও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি শিশু সামিউল আলম রাজন। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে পানি চেয়েছিলো সে। ঘাতকরা তাকে পানির বদলে ঘাম খেতে বলে। বাঁচার জন্য বারবার মিনতি জানালে ঘাতকদের অত্যাচার, উৎপীড়ন এবং নির্মম মারপিট ও লাঠির আঘাতে তার মৃত্যু হয়।
আর খুনের ঘটনা আড়াল করতে ভ্যান চুরির মিথ্যা অপবাদের কালিমা লেপন করেছিলো ঘাতকরা। মূলত; চুরি ঘটনাটি ছিল মিথ্যা, বানোয়াট। এই একটি মাত্র কারণ ছাড়া আর কোনো ক্লু মিলেনি তদন্তে।
আদালতে দাখিলকৃত চার্জশিটে এমন এমন পৈচাশিকতার বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। ১৬ আগস্ট আলোচিত এই মামলার চার্জশিট (নং৮১) অনেকটা গোপনে আদালতে দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদার। ২৪ আগস্ট চার্জশিটের ওপর শুনানির দিন নির্ধারণ করেন আদালতের বিচারক।
চার্জশিট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসআই আমিনুলের দায়ের করা মামলায় সৌদি পলাতক কামরুলসহ তিনজকে পলাতক দেখিয়ে ১৩ জনকে আসামি দেখানো হয়েছে। আর অব্যহতি চাওয়া হয়েছে দু’জনের।
তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেন, ১৬ আগস্ট মামলাটি প্রাপ্ত হয়ে তিনি তদন্তকালে নিহত শিশু রাজনের বাবার দেওয়া অভিযোগটিও একত্রে তদন্ত করেন। আসামিরা অত্যন্ত নিষ্টুর প্রকৃতির বলে লোক মারফত জানেন। এসময় জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ময়না, নুর মিয়া, দুলাল, মুহিত আলম, আলী হায়দার, আয়াজ আলী নিজেদের জড়িত দোষ বলে হত্যাসহ গুম সংক্রান্তে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়।
তদন্তকালে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে ফুটেজের দৃশ্যে তাদের জবানবন্দির অংশ বিশেষ বলে দৃশ্যমান হয়। তদন্তকালে আসামিদের নাম-ঠিকানাও যাচাই করা হয়। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারেরও চেষ্টা করেন।
আসামি কামরুলকে ঘটনার পর ১৩ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সহায়তায় প্রবাসী বাংলাদেশী ও স্থানীয় লোকজন আটক করে সৌদি পুলিশ হেফাজতে দেয়। তাকে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং পুলিশ সদর দফতরের মাধ্যমে সৌদিআবরে পত্রালাপ চলছে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
সুরঞ্জিত তালুকদার তদন্তকালে জানতে পারেন- ঘটনার দিন (৮জুলাই) সকালে শিশু রাজন নিজের ক্ষেতের ঝিঙ্গা ও চিঙ্গিা বিক্রির জন্য ভোরে টুকেরবাজার যায়। সজ্বি বিক্রির পর সকাল ৬টায় কুমারগাঁও লালাই মিয়ার মার্কেটস্থ খান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের সামনে ঘুরাঘুরি করলে মার্কেটের চৌকিদার ময়না, ফিরোজ আলী, আয়াজ আলী ও দুলাল তাকে আটক করে খান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের সামনে খুটির সঙ্গে নাইলনের রশি দিয়ে পিঠমোড়া করে বেধে রাখে।
রাজন ভ্যান গাড়ি চুরির জন্য এসেছিলো, এরূপ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ময়না, ফিরোজ, আয়াজ আলী, দুলালরা খুন করার উদ্দেশ্যে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করে। মারপিটের এক পর্যায়ে আসামি কামরুল, জাকির হোসেন পাবেল, নুর আহমদ, তাজ উদ্দিন বাদল, আজমত উল্লা, রুহুল আমিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের মঙ্গে মারধরে যোগ দেয়।
মারপিঠের এক পর্যায়ে কামরুল টান দিয়ে ময়নার হাত থেকে কালো ট্যাপ মোড়ানো বাশের লাঠি দিয়ে শিশু রাজনকে খুন করতেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতন করে। উপর্যুপরি আঘাতে চিৎকার করতে থাকে রাজন। তখন আসামি নুর আহমদ কামরুলকে উদ্দেশ্য করে বলে- মামু তুমি সাইজ করো, আমি ভিডিও করতেছি। এ কথা বলে উল্লাস করে মারপিঠের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে।
চার্জশিটে উল্লেখ- খুনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আসামিরা মরিয়া হয়ে উঠে। আসামি কামরুল, আলী হায়দার, মুহিত আলম তড়িঘড়ি করে ঢাকা মেট্টো চ-৫৪-০৫১৬ যোগে রাজনের মরদেহ গুম করার চেষ্টাকালে মুহিত আলম আটক হয় এবং অন্যরা পালিয়ে যায়।
আসামিরা শিশু রাজন ভ্যান গাড়ি চুরি করতে এসেছিলো বলে যে প্রচারণা চালায়, তদন্তকালে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। মূলত আসামিরা খুনের দায় এড়ানোর জন্য ভ্যান চুরির বানোয়াট ঘটনার কথা অপপ্রচার করে। তাছাড়া তদন্তকালে আসামিদের কোনো ভ্যান গাড়ি আছে-এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে দায়েরকৃত চার্জশিটে আসামিরা-৩০২/২০১/৩৪ দণ্ডবিধির অপরাধ করেছে উল্লেখ করা হয়।
হত্যা মামলার চার্জশিটে আসামিরা হলেন- মহানগরীর জালালাবাদ থানার শেখপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল মানিকের ছেলে কামরুল ইসলাম ওরফে কামরুল (৩০), একই থানার পীরপুর গ্রামের মৃত মব উল্লাহর ছেলে সাদিক আহমদ ওরফে বড় ময়না (৩৫), কামরুলের তিন সহোদর মহিত আলম (৩৫), আলী হায়দার ওরফে আলী (৪২), শামীম আহমদ ওরফে শামীম (৩২), শেখপাড়ার সুলতান মিয়ার ছেলে তাজ উদ্দিন আহমদ ওরফে বাদল (১৯), জালালাবাদ থানার পূর্ব জাঙ্গাইল গ্রামের মো. নিজাম উদ্দিনের ছেলে নূর মিয়া(২০), সুনামগঞ্জের দোয়ারা উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের জাহাঙ্গীর গাঁওয়ের মোস্তফা আলী ওরফে পেঁচা’র ছেলে ও শেখপাড়া মোতালিব লস্করের বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. আয়াজ আলী, জালালাবাদ থানার হায়দরপুর গ্রামের মৃত সাহাব উদ্দিনের ছেলে রুহুল আমিন রুহেল (২৮), সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের অলিউর রহমান ওরফে অলিউল্লাহর ছেলে মো. জাকির হোসেন পাবেল ওরফে রাজু (২২), শেখপাড়া গ্রামের মৃত আলা উদ্দিন আহমদের ছেলে দুলাল আহমদ (৩০), সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ কুর্শি ইসলামপুর গ্রামের মৃত মজিদ উল্লাহর ছেলে মো. ফিরোজ আলী (৬৫) ও সিলেট সদর উপজেলার কুমারগাঁওয়ের (মোল্লাবাড়ি) মৃত সেলিম উল্লাহর ছেলে মো. আজমত উল্লাহ (৫৫)।
এছাড়া চার্জশিট থেকে মুহত আলমের স্ত্রী লিপি বেগম ও ইসমাইল আলী আবলুছের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ না পাওয়া তাদেরকে অব্যহতি দানের সুপারিশ করা হয়।
চার্জশিটে নিহত শিশু রাজনের কাপড়-চোপড়, মরদেহ বহনকৃত মাইক্রোবাসসহ ৯টি আলামতের কথা উল্লেখ করা হয়। মামলায় ৩৮ স্বাক্ষীর মধ্যে প্রথম বাদি এসআই আমিনুল (বর‌খাস্তকৃত)।এছাড়া রাজনের বাবা আজিজুল ইসলাম আলমকে দ্বিতীয়, মা লুবনা বেগম ৩য়, চাচা আল আমিনকে ৪র্থ স্বাক্ষী করা হয়।
হত্যাকারীদের বাঁচাতে চেষ্টা চালানোর অভিযোগে লাঞ্ছিত ইউপি সদস্য গিয়াস মিয়াকে মামলার ১৬ নং স্বাক্ষী ও এই মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা জালালাবাদ থানার(ওসি তদন্ত) আলমগীর হোসেনকে ৩৭ নং স্বাক্ষী করা হয়েছে। তিনিও বরখাস্ত রয়েছেন।
এছাড়া চার্জশিটে সংযোজন করা হয় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. তাহমিনা ইসলাম কর্তৃক দেওয়া রাজনের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন। এতে উল্লেখ করা হয়- নিহত রাজনের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যাপক কালশিটে দাগ। শরীরের বিভিন্ন অংশে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মস্তিস্কে আঘাতে রক্ত ক্ষরণ জনিত কারণে রাজনের মৃত্যু হয়েছে এই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ৮ জুলাই সকালে সিলেট নগরীর উপকণ্ঠ কুমারগাঁও এলাকায় পৈচাশিক নির্যাতন করে শিশু রাজনকে হত্যা করা হয়। নিহত রাজন সদর উপজেলার কান্দিরগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের আজিজুর রহমান আলমের ছেলে। এঘটনার পর নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন বিবেকবান মানুষ।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: