মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
তারেককে ঠেকাতে আদালতে যাবে আওয়ামী লীগ  » «   ইসি সচিব, ডিএমপি কমিশনারসহ ৪ জনের শাস্তি দাবি  » «   ভারতে অস্ত্র গুদামে বিস্ফোরণ : নিহত ৬, আহত ১৮  » «   ‘ছোলপোলের খোঁজ লেয় না, আবার এমপির ভোট করিচ্চে’  » «   হিরো আলমকে নিয়ে মুখ খুললেন তসলিমা নাসরিন  » «   এইডসের ঝুঁকিতে সিলেট, মৌলভীবাজার  » «   চুক্তি বাতিল করলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : পুতিন  » «   প্রধানমন্ত্রী রেফারি হলে ফেয়ার ইলেকশন হয় না : ড.কামাল  » «   ২০ দলের শরিকদের ৩৫-৪০ আসন দিতে চায় বিএনপি  » «   নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকবে ১১৮ দেশীয় সংস্থা: ইসি সচিব  » «   তৃতীয় দিনের সাক্ষাৎকার চলছে: যুক্ত হতে পারেননি তারেক রহমান  » «   শিকাগোর হাসপাতালে বন্দুকধারীর হামলা, নিহত ৪  » «   পূজা করে তাজমহলকে পবিত্র করেছে হিন্দুরা!  » «   নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুন মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ  » «   গণফোরামে যোগ দিলেন সাবেক ১০ সেনা কর্মকর্তা  » «  

ভ্যান চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নামে জমি, এরপর…



হায়দার আলী: ঢাকার শ্যামলীতে রাস্তার পাশে তুমুল ঝগড়া হচ্ছে। লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কানে এলো—ঝগড়ার মাঝে উচ্চারিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনার নাম। থমকে দাঁড়ালাম। দেখি ছেঁড়া ময়লা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা আর লুঙ্গি পরা এক যুবক শ্যামলী ২ নম্বর রোডের কাজি অফিসের রাস্তার পাশে ঝগড়ায় ব্যস্ত। কিছুক্ষণ ঝগড়া শোনার পর একপর্যায়ে যুবককে উদ্দেশ্য করে বললাম, ‘আপনারা ঝগড়া করছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনা আপনাদের কী ক্ষতি করল?’ ঝাঁজালো জবাব দিয়ে দ্রুত চলে গেলেন যুবক।

জানতে পারলাম, বৃদ্ধার নাম রমিজা খাতুন আর যুবকটি আব্দুল কাদির। তাঁরা মা-ছেলে। ছেলে চলে যাওয়ার পর রমিজা ওখানে দাঁড়িয়েই কাঁদতে থাকেন। জড়ো হওয়া কয়েকজন জানালেন, রমিজার স্বামী হাসমত আলী ছেলের নামে জমি না রেখে শেখ হাসিনার নামে রেখেছেন বলে ছেলে কাদির মাকে ভাত-কাপড় দেয় না।

চমকে উঠলাম। শেখ হাসিনার নামে জমি রেখেছেন মানে! বিদ্যুচ্চমকের মতো মাথায় খেলল সাংবাদিকতার সূত্র। ‘শেখ হাসিনার নামে যে জমি রেখেছেন তার কোনো প্রমাণ আছে কি?’

বৃদ্ধা রমিজা কোমরে গুঁজে রাখা একটা দলিলের কপি বের করে দেখালেন। দেখি দলিলের গ্রহীতার স্থানে লেখা, ‘শেখ হাসিনা, পতি-ওয়াজেদ আলী, সুধা সদন, ধানমণ্ডি, ঢাকা’।

পেয়ে গেলাম নিউজের রত্ন। রমিজা খাতুনকে বললাম, ‘চলুন, আপনার বাসায় গিয়ে কথা বলি।’ রমিজা বললেন, ‘বাবা, আমি খামু কী? ভিক্ষা না করলে তো পেটের ভাত জুটব না।’ বললাম, ‘ভিক্ষা করে দিনে কত পান?’ রমিজা জানালেন, ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। পকেট থেকে ২০০ টাকা বের করে তাঁর হাতে দিয়ে বললাম, ‘আপনার বাসায় চলেন, আজ আর ভিক্ষা করতে হবে না।’

বস্তির ছোট্ট খুপরি ঘরটিতে গিয়ে বসে গল্প জুড়ে দিই রমিজার সঙ্গে। সব জেনেবুঝে হতবাক হয়ে যাই। রমিজার স্বামী হাসমত আলী রিকশাভ্যান চালিয়ে তিলে তিলে জমানো টাকা দিয়ে নিজের নামে নয়, একমাত্র সন্তান আব্দুল কাদির কিংবা স্ত্রী রমিজা খাতুনের নামেও নয়, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে একখণ্ড জমি কিনে রেখে গেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ‘এতিম’ শেখ হাসিনার নামে!

২০১০ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার এমন বিরল ঘটনা জেনে আমার দিশাহারা অবস্থা। কাউকে কিছু বললাম না; ছুটলাম গফরগাঁওয়ে। সেখানকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে খোঁজ নিলাম শেখ হাসিনার নামে করা দলিলটির নম্বর আর মূল ভলিউমের দলিলের নম্বর ঠিক আছে কি না। ২০০ টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে একজনকে খোঁজ নিতে পাঠাই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এসে এক কর্মকর্তা জানালেন, হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। ৫০০ টাকার বিনিময়ে তুলে নিলাম দলিলের একটি সার্টিফায়েড কপি। সেই কপি হাতে নিয়ে ছুটলাম হাসমত আলীর কেনা জমিতে। পাড়া-প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথাবার্তা বলে, সব কিছু জেনে চলে এলাম ঢাকায়। প্রতিদিনই একটু করে লিখতে থাকলাম। প্রায় দুই মাস পর ২০১০ সালের ২ জুন দেশের প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমে প্রধান প্রতিবেদন হিসেবে ‘বিরল ভালোবাসা’ শিরোনামে ছাপা হয় সেই খবর।

বঙ্গবন্ধু অন্তপ্রাণ গফরগাঁওয়ের ভ্যানচালক হাসমত আলী শুধু মিছিল-মিটিংয়ে ছুটে বেড়িয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না; ১৯৭৫-এর হত্যাযজ্ঞের পর বঙ্গবন্ধুর ‘এতিম’ মেয়েদের নিয়ে তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। সারা জীবনের জমানো টাকা দিয়ে গফরগাঁওয়ের রাওনা ইউনিয়নের খারুয়া বড়াইল গ্রামে সাত শতক জমি কেনেন শেখ হাসিনার নামে। শেষ জীবনে এসে ভয়ানক ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন হাসমত, তবু বেচেননি ‘মেয়ে হাসিনার’ নামে কেনা জমিটি। হাসমত আলী মারা যাওয়ার আগে জমির দলিলটি স্ত্রী রমিজা খাতুনের হাতে তুলে দিয়ে বলে যান, যে করেই হোক দলিলটি যেন শেখ হাসিনার হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

স্বামীর মৃত্যুর পর রমিজা অথই সাগরে পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত ভিক্ষার থালা তুলে নেন হাতে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির চারপাশে ভিক্ষা করেন আর স্বামীর রেখে যাওয়া জমির দলিলটি শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিরল ভালোবাসার এই প্রতিবেদন সারা দেশে আলোড়ন তোলে। সেদিন খুব ভোর থেকে আমার মোবাইলে একের পর এক ফোন আসতে থাকে, মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। কেউ রমিজার দায়িত্ব নিতে চান, কেউ সহযোগিতা করতে চান।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আবেগাপ্লুত হন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর বিশেষ সহকারী সেলিমা খাতুন (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২) রমিজা খাতুনের খোঁজ নেন এবং রমিজা ও আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলবেন বলে জানান।

প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন ৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অবশেষে শেখ হাসিনার দেখা পেলেন রমিজা খাতুন। রমিজাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী। ঘোষণা দিলেন, হাসমত আলীর কেনা জমিটি রমিজা খাতুনের নামে লিখে দেবেন, সেখানে একটি বাড়ি বানিয়ে দেবেন আর রমিজার পুরো জীবনের দায়িত্ব নেবেন তিনি; বাড়ি না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি করে রমিজার যা যা চিকিৎসা লাগে করানোর নির্দেশ দিলেন সংশ্লিষ্টদের। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘এই যে সত্য ঘটনাটা তুলে ধরলে, যার মাধ্যমে সবাই জানল, আমি জানতে পারলাম, না হলে তো আমার জানার সুযোগই হতো না। এটা একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ ধরনের মহৎ সাংবাদিকতার জন্য আমি তোমাকে দোয়া করি, তুমি অনেক বড় হও।’ এরপর শেখ হাসিনা বললেন, ‘আমি তোমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিতে চাই।’ আমি বললাম, ‘প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর অগণিত মানুষের অভিনন্দন পেয়েছি, আপনার দোয়া পেয়েছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় উপহার।’ তিনি বললেন, ‘আমি বড় আপা, আমি তোমাকে দিচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এক তোড়া টাকা বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। এক লাখ টাকার তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। চোখ ভিজে এলো অজানা আবেগে।

উদ্বেলিত মনে অফিসে ফিরে এলে আরেক বিস্ময়—সহকর্মীদের উচ্ছ্বাস, ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া; মালিকপক্ষ ডেকে নিয়ে অকুণ্ঠ প্রশংসা, সমাদরে ভরিয়ে দেওয়া—সাংবাদিকের চির অতৃপ্ত মনটা যেন উপচে পড়ল অনেক পাওয়ায়।

আরো ভালো লাগে চোখের পলকে রমিজার জীবনচিত্র বদলে যেতে দেখে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল মজিদ ভূইয়ার তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলে রমিজার।

শেখ হাসিনার নামে কেনা জমিটির দলিল ২০১০ সালের ১৭ জুলাই রমিজা খাতুনকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায় সেখানে রমিজার জন্য বাড়ি বানানোর কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। জমিটি হস্তান্তরের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন। সেই প্রতিবেদনটিও ছাপা হয় গুরুত্বসহকারে।

গফরগাঁওয়ের সেই জমিতে বাড়ি নির্মাণের পর ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই বাড়িতে গিয়ে রমিজা খাতুনকে উঠিয়ে দিয়ে আসেন। আমাকেও সেদিন সঙ্গে রাখেন। বাড়িতে আসবাবসহ যাবতীয় জিনিস আনা হয়। প্রতি মাসে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন থেকে ভাতা পাচ্ছেন রমিজা খাতুন। সেই বাড়িতে এখন দুই নাতিসহ পরিবার নিয়ে সুখেই কাটছে তাঁর জীবন। তাঁর একমাত্র ছেলে আব্দুল কাদিরকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরিও দেওয়া হয়েছে। রমিজার বাড়িটি এক নজর দেখার জন্য ময়মনসিংহসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসে, রমিজার সঙ্গে গল্প করে।

রমিজা খাতুন প্রায়ই আমাকে ফোন করেন, তাঁর বাড়িতে দাওয়াত দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করেন।

বিরল ভালোবাসার এই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষের আর্থিক সহযোগিতায় একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন সাংবাদিক ফারুক মেহেদী। ‘বিরল ভালোবাসা’ নামের সেই প্রামাণ্যচিত্রটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে জাতিসংঘে পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

নির্মাতা ফারুক মেহেদী জানান, জাতির পিতাকে হত্যার পর ২০০৩ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনার জন্য এক খণ্ড জমি কিনে দেন গফরগাঁওয়ের দরিদ্র ভ্যানচালক হাসমত আলী। পরে প্রধানমন্ত্রী জমির দলিল হাসমতের স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেন। হসমতের স্ত্রী রমিজাকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে ওই বাড়িতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। সূত্র: কালের কণ্ঠ

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: