সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
ক্লিনটনের যৌন কেচ্ছা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য হিলারির  » «   সংসদ নির্বাচনের জন্য ৭০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন  » «   বাল্যবিবাহের বিশেষ বিধান ‘ধর্ষণে’ প্রযোজ্য নয়  » «   বিশ্বনাথে প্রবাসীর স্ত্রীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায়…  » «   যেসব কারণে ইসির সভা থেকে বেরিয়ে যান কমিশনার মাহবুব  » «   সৌদি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করলেই গুম-হত্যা!  » «   শাস্তির বিধান রেখে সম্প্রচার আইনের খসড়া অনুমোদন  » «   সম্পাদক পরিষদের তথ্যে ঘাটতি আছে: তথ্যমন্ত্রী  » «   প্রশ্নফাঁস: ঢাবির ঘ ইউনিটের ফল প্রকাশ স্থগিত  » «   আমেরিকার সতর্কতার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থার হুমকি সৌদির  » «   বন্দরবাজারে স্বেচ্ছাসবক দলের মিছিলে পুলিশের বাধা, আটক ১  » «   সন্ত্রাসীদের হুমকি নভেম্বরেই খুন করা হবে মোদিকে!  » «   শাহবাগ-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা বন্ধে আইনি নোটিশ  » «   ফেক এনকাউন্টার: ভারতে সাত সেনা সদস্যের যাবজ্জীবন  » «   আবারো নির্বাচন কমিশনের সভা বর্জন করলেন কমিশনার মাহবুব  » «  

বই, বইয়ের মেলা



ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল:: পৃথিবীতে যত রকমের মেলা হতে পারে তার মাঝে সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে বইমেলা। আমার ধারণা পৃথিবীতে যত বইমেলা আছে তার মাঝে সবচেয়ে মধুর বইমেলা হচ্ছে আমাদের ফেব্রুয়ারি বইমেলা। কোনো কিছু না করে বইমেলার এক কোণায় চুপচাপ বসে থেকে শুধুমাত্র মেলার মানুষজনকে দেখে আমি আমার একটি জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। মেলায় গুরুগম্ভীর বয়স্ক মানুষ যায়, কমবয়সী তরুণ-তরুণী যায়, বাবা মায়ের হাত ধরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যায়, প্রত্যেকের ভাবভঙ্গি চালচলন আলাদা। কেউ বই কেনে, কেউ বই দেখে, আবার কেউ শুধু ঘুরে বেড়ায়। এই অতি চমত্কার বইমেলাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হয়েছে, আমি সিলেটে বসে আছি, লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করছি কবে বইমেলায় যাব।

গতবার বইমেলায় গিয়ে অবশ্য আমার এক ধরনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বাচ্চা-কাচ্চার জন্যে বই লিখি বলে আমাকে একসময় প্রচুর অটোগ্রাফ দিতে হতো। কমবয়সী ছেলেমেয়েরা বই নিয়ে ভিড় করে আসতো। এখনো ভিড় করে আসে, কিন্তু তাদের হাতে এখন প্রায় সময়েই কোনো বই নেই, তার বদলে আছে একটা স্মার্টফোন। সেই ফোন দিয়ে তারা সেলফি তুলতে থাকে। সেলফি বা ছবি তোলার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু বইমেলায় বইয়ের ওপর অটোগ্রাফ না নিয়ে শুধু একটা সেলফি তুলে সন্তুষ্ট হয়ে চলে গেলে আমি একটু অস্বস্তি বোধ করি। এই স্যোশাল নেটওয়ার্ক বা ফেসবুকের যুগেও আমি সাংঘাতিকভাবে বইপন্থি মানুষ। যতই দিন যাচ্ছে আমি ততই বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে একটা মানুষকে পরিপূর্ণ হতে হলে তাকে অবশ্যই বই পড়তে হবে।

আমার ধারণা মানুষ আর পশুপাখির মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে মানুষ বিমূর্ত চিন্তা করতে পারে, পশুপাখি পারে না। যতরকম বিমূর্ত চিন্তা আছে তার মাঝে সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে বই পড়া। কাজেই কেউ যেন মনে না করে বই পড়াটি শুধু এক ধরনের বিনোদন, এটি তার থেকেও অনেক বড় একটি ব্যাপার। আমাদের একমাত্র সম্পদ হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কটি। সেই মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় ব্যায়াম হতে পারে বই পড়া। মস্তিষ্ককে শানিত করার এর থেকে কার্যকর আর কিছু হতে পারে না। স্যোশাল নেটওয়ার্ক জাতীয় সম্পদের প্রবল আক্রমণের সামনে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হতে পারে বই। তাই আমার মনে হয় রীতিমতো যুদ্ধ করে হলেও আমাদের সবাইকে বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে। সেজন্য ফেব্রুয়ারির বইমেলা দেখে আমি এতো উত্তেজিত হয়ে যাই।

২. এবারের বইমেলায় আমার জন্যে একটা অত্যন্ত চমকপ্রদ ব্যাপার ঘটেছে। সেটা হচ্ছে সায়েন্স ফিকশন ক্যাটাগরিতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া! দিন দশেক আগে আমি কলকাতা গিয়েছিলাম। সেখানে খুব জাঁকজমক করে কলকাতা লিট ফেস্টিভ্যাল হয়। সেখান থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল পরাবাস্তব লেখার জন্যে। মঞ্চে আমি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পাশে বসেছিলাম, সেটি আমার জন্যে অনেক বড় একটি অভিজ্ঞতা। সেখানে আমার কাছ থেকে বাংলাদেশের সায়েন্স ফিকশন লেখালেখি নিয়ে জানতে চেয়েছিল। আমি অনেক জোরগলায় বলে এসেছি বাংলাদেশের পাঠক নিশ্চয়ই সায়েন্স ফিকশন পড়তে খুব পছন্দ করে, কারণ আমাদের দেশে অনেক সায়েন্স ফিকশন লেখক। শুধু তাই নয়, তারা একটা সোসাইটি করেছেন এবং বইমেলায় তারা র্যালি করে গিয়ে দলবেঁধে একসাথে সায়েন্স ফিকশন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।

তবে কলকাতার মানুষকে যেটা বলিনি, সেটা হচ্ছে দেশের সাহিত্যের মূল ধারার মানুষেরা সায়েন্স ফিকশনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। সবাই ধরেই নেয় সাহিত্যের কিছু সম্ভ্রান্ত এলাকা আছে, যারা সেই এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে পারে, তারাই প্রকৃত সাহিত্যিক! অন্যেরা লেখক, দলিল লেখক কিংবা সায়েন্স ফিকশন লেখকের মাঝে বড় কোনো পার্থক্য নেই। আজকাল অনেক রকম সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই একজন প্রবীণ এবং একজন নবীন লেখক নেওয়া হয়। নবীন লেখকদের বেলায় কখনো একজন সায়েন্স ফিকশন লেখককে বেছে নিতে দেখিনি! যদিও অনেকেই আছেন যারা খুব চমত্কার লেখেন।

এরকম একটা অবস্থায় যদি হঠাৎ করে আবিষ্কার করি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা পুরস্কার সায়েন্স ফিকশন ক্যাটারিতে দেওয়া হয়েছে, তাহলে অবশ্যই আনন্দিত হওয়ার কারণ আছে। মনে হচ্ছে সাহিত্যের জগত্টা কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা ছিল, শুধুমাত্র সম্ভ্রান্ত কিছু মানুষ সেখানে যেতে পারত, হঠাৎ করে কাঁটাতার তুলে দিয়ে সেখানে অন্যদেরকেও ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। সায়েন্স ফিকশন লেখক ঢুকেছেন তাদের পিছু পিছু ভৌতিক গল্প লেখকরা ঢুকে যাবেন, তার পিছু পিছু রহস্য উপন্যাসের লেখক এবং সবার শেষে শিশু-সাহিত্যিকরা!

এই বছর সায়েন্স ফিকশনের জন্যে পুরস্কার পেয়েছেন মোশতাক আহমেদ, তাকে আমি অনেকদিন থেকে চিনি। চেনা মানুষ পুরস্কার পেলে আনন্দ বেশি হয়। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশদের অবদান নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন, বইটির নাম নক্ষত্রের রাজারবাগ। মোশতাক আহমেদ আমাকে অনুরোধ করেছিলেন বইটির মোড়ক উন্মোচন করে দিতে এবং আমি আনন্দের সাথে রাজি হয়েছিলাম। কোনো একটা কারণে নির্দিষ্ট সময়ে মোশতাক আহমেদ জরুরি কাজে আটকা পড়ে গেলেন এবং বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হলো না। আমি সেদিনই ঢাকা থেকে সিলেট চলে এসেছি। পরদিন ভোরে আমি অফিসে গিয়েছি, গিয়ে দেখি মোশতাক আহমেদ আমার অফিসের সামনে অপেক্ষা করছেন, তার হাতে রঙিন কাগজে মোড়ানো একটি বই। আমাকে বললেন, বইটির মোড়ক উন্মোচন করানোর জন্যে তিনি রাতের ট্রেনে ঢাকা থেকে সিলেট চলে এসেছেন! তিনি ঠিক করেছিলেন আমাকে দিয়ে মোড়ক উন্মোচন করাবেন, কাজেই সেটি তিনি করে ছাড়বেন। আমি সবসময়েই দেখে এসেছি মোড়ক উন্মোচন হয় দশজনের সামনে রীতিমতো একটা আনন্দঘন অনুষ্ঠান। কিন্তু নক্ষত্রের রাজারবাগ মোড়ক উন্মোচনটি হলো আমার অফিসে। আমি আর মোশতাক আহমেদ ছাড়া কেউ নেই। আমি মোড়কটি উন্মোচন করলাম। তিনি আমার হাতে বইটি তুলে দিয়ে তক্ষুণি ছুটলেন ঢাকা। আমার জীবনে এর চাইতে বিচিত্র মোড়ক উন্মোচন আর কখনো হয়নি, মনে হয় আর কখনো হবে না। ২০১২ সালে এই বইটি যখন কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিল তখন আমার চাইতে বেশি খুশি মনে হয় আর কেউ হয়নি।

৩. আমি প্রতিবছরই ভাবি বইমেলার আগে আমি কয়েকজন নতুন লেখকের বই নিয়ে কিছু লিখব, কিন্তু কখনো সেটি ঠিক করে করতে পারিনি। এই বছরও সেটি করা হলো না কারণ মেলায় আগে নতুন লেখকের বইগুলো খুঁজে পড়তে পারিনি। বইটি পড়া হয়নি কিন্তু বইমেলায় গিয়ে যে বইটি কিনব বলে ঠিক করে রেখেছি সেই বইটি নিয়ে দু’একটি লাইন অন্তত লিখি।

দুই বছর আগে একজন মা আমাকে একটা ই-মেইল পাঠিয়েছিল। তার শিশু সন্তানটি কোনো একটি রক্তজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। অপ্রতিরোধ্য শোকে দিশেহারা হয়ে সেই মা শিশুটির শেষ কয়েকটি দিনের কথা লিখে আমাকে অনুরোধ করেছিল যদি সম্ভব হয় তাহলে আমি যেন এই ধরনের শিশুদের নিয়ে কিছু একটা লিখি। একজন লেখক যখন কোনো গল্প বা উপন্যাস লিখে সেটি পড়ে অনেক সময়েই আমরা ব্যাকুল হয়ে যাই, কখনো কখনো সেই কাল্পনিক চরিত্রের দুঃখ-কষ্টে আমাদের চোখে পানি চলে আসে। কিন্তু বই পড়া শেষ হলে আমরা চোখ মুছে হাসিমুখে নিজের কাজে ফিরে যাই, কারণ আমরা জানি আমাদের দুঃখটি সত্যিকারের দুঃখ নয় কারণ চরিত্রগুলো কাল্পনিক।

কিন্তু একজন মা যখন তার শিশু সন্তানের জীবনের শেষ মুহূর্তের ঘটনাগুলো গভীর মমতা দিয়ে লিখে পাঠান, সেটি পড়ে চোখ মুছে আবার হাসি মুখে নিজের কাজে ফিরে যাওয়া যায় না। কারণ চরিত্রগুলো কাল্পনিক নয়, তারা সত্যি। বুকের ভেতর কোথায় জানি ব্যথা টন টন করতে থাকে।

আমি এরকম মৃত্যুপথযাত্রী কিন্তু প্রণোচ্ছল হাসিখুশি একটি শিশুকে নিয়ে লিখতে পারব বলে মনে হয় না। তাই আমি ভাবছিলাম মা’টিকে চিঠি লিখে বলব-তোমার এই অচিন্তনীয় কষ্টের কথাগুলো তুমি নিজেই কষ্ট করে লিখো। তোমার মতো অন্য যারা আছে তারা হয়তো তোমার লেখাটি থেকেই সান্ত্বনা পাবে। আমি তার সাথে যোগাযোগ করার আগেই সেই কমবয়সী মা আমাকে লিখে জানালো সে বুকে পাথর বেঁধে কাহিনিটি লিখেছে। সে একা নয়, তার মতো আরো যারা দুর্ভাগা মা রয়েছেন তারাও লিখেছেন। এই বইটি দিয়ে তারা এরকম অসহায় মা’দের মাঝে একটা যোগসূত্র তৈরি করতে চাইছে যেন শেষ মুহূর্তে তাদের সন্তানেরা সত্যিকার চিকিত্সা পেতে পারে, সম্ভব হলে শিশুটিকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে। বইমেলায় গিয়ে আমি বইটি কিনব। বইটির নাম: ‘ওরা নেই ওরা আছে’। শোকাতুর মায়ের নাম সায়মা সাফিজ সুমী।

৪. এই বছর বইমেলায় গিয়ে আমি আরো একটি বই সংগ্রহ করব, কিন্তু আমি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত সেই বইটি আমি নেড়ে-চেড়ে দেখব, চোখ বুলাব কিন্তু পড়ার সাহস পাব না। বইটির নাম ‘বীরাঙ্গনা রচনাসমগ্র’, লেখিকার নাম: সুরমা জাহিদ, প্রকাশকের নাম অন্বেষা। সুরমা জাহিদ এবারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখার জন্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। এর চাইতে যথার্থ পুরস্কার আর কিছু হতে পারে কি না আমার জানা নেই।

সুরমা জাহিদের জন্ম ১৯৭০ সালে, একাত্তরে তিনি একজন অবোধ শিশু ছিলেন, তারপরও একাত্তর সালের বীরাঙ্গনাদের জন্যে তার ভেতরে একধরনের গভীর মমতা রয়েছে। সেই মমতা এবং ভালোবাসায় তিনি বীরাঙ্গনাদের নিয়ে সাতটি বই লিখেছেন। সেই বইগুলোকে সংকলিত করে পঞ্চান্নটি ভিন্ন ভিন্ন জেলার মোট ৩৬১ জন বীরাঙ্গনাকে নিয়ে ‘বীরাঙ্গনা রচনাসমগ্র’ বইটি দাঁড় করেছেন। একদিকে মানুষের নিষ্ঠুরতার অন্যদিকে নারীদের দুঃখ-কষ্ট এবং বেদনার ইতিহাস—এর চাইতে বড় কোনো দলিল আছে বলে আমার জানা নেই।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধ কর্নার আছে। সেখানে আমরা সুরমা জাহিদের বীরাঙ্গনাদের ওপর লেখা বইগুলো সংগ্রহ করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের যে কোনো ইতিহাস আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি, কিন্তু তারপরও সুরমা জাহিদের লেখা এই বইগুলো আমি পড়তে পারি না। বুকের ভেতর এক ধরনের রক্তক্ষরণ হয়। তারপরও আমি হৃদয়ের রক্তক্ষরণের এই বইটি বইমেলা থেকে সংগ্রহ করব।

৫. বইমেলা নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি এবারে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে লিখি। সেটি হচ্ছে নতুন লেখক এবং তাদের প্রকাশিত বই। আমি মোটেও জানতাম না যে আমাদের বইমেলায় নতুন লেখকেরা যে বই প্রকাশ করেন সেই বইগুলো তারা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে ছাপান। বিষয়টি জানার পর আমি প্রকাশকদের সাথে কথা বলেছি, তারা আমাকে জানিয়েছেন বইমেলায় প্রকাশিত শতকরা সত্তর থেকে আশি ভাগ বই নাকি এরকম নিজের পকেটের টাকায় ছাপানো বই। অন্যরা বলেছেন সংখ্যাটি নাকি আরো বড়।

যদি একজন লেখক নিজের পকেটের টাকা দিয়ে কোনো একজন প্রকাশককে দিয়ে তার বই বের করেন তাহলে সেই প্রকাশককে ‘প্রকাশক বলা যাবে না, তাকে ‘মুদ্রক’ বা এই ধরনের কিছু বলতে হবে। প্রকাশক তিনি, যিনি কোনো একজন লেখক গবেষকের কাজটুকু নিজের দায়িত্বে পাঠকদের সামনে তুলে ধরবেন। সেই কাজটুকু করার জন্য তার যদি অর্থের প্রয়োজন হয় সেই অর্থটুকু প্রকাশকের নিজের জোগাড় করতে হবে। যদি প্রকাশকের সেই অর্থ না থাকে তাহলে বুঝতে হবে প্রকাশনার বিষয়টি তার জন্যে নয়—তাকে অন্য কোনো কাজ খুঁজে নিতে হবে।

ঠিক একইভাবে নতুন লেখকের জন্যেও বলতে হবে যদি কোনো লেখক নিজের পকেটের টাকা দিয়ে একটা বই প্রকাশ করে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে তার বইটি এখনো প্রকাশের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। কেউ যদি সত্যি সত্যি লেখা-লেখি করতে চায় তাহলে তাকে কোনোভাবেই নিজের টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করা চলবে না। এটি এক ধরনের অসম্মান। একজন সত্যিকারের লেখক কোনোভাবেই নিজেকে অসম্মানিত করতে পারে না।

নতুন লেখকদের সবসময়েই বলতে শোনা যায় তারা নতুন লেখক বলে কেউ তাদের লেখা ছাপতে চায় না। এই অভিযোগটি অনেক পুরোনো, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেটি মানতে রাজি ছিলেন না। তার বন্ধুদের বলেছিলেন অভিযোগটি সত্যি নয়, ভালো লেখা হলেই ছাপা হবে। শুধু তাই না বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে একেবারেই অপরিচিত নতুন লেখক হিসেবে তিনি ‘অতসী মামী’ নামে একটি গল্প লিখে সেই সময়কার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ম্যাগাজিনে ছাপিয়েছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উদাহরণ আমাদের দেশেও অনেক আছে। সবচেয়ে বড় কথা এখন যারা প্রতিষ্ঠিত লেখক তারা সবাই একসময় নতুন লেখক ছিলেন, অপরিচিত লেখক ছিলেন। কাজেই নতুন লেখককে কেউ গুরুত্ব দেয় না, সেই অভিযোগটি আমি শুনতে রাজি নই।

এখন ইন্টারনেট এবং ব্লগ আছে, কাজেই নতুন লেখকেরা সেখানে লেখালেখি করতে পারেন। সেখানে বুঝতে পারবেন তার লেখালেখি কতোটুকু মানসম্মত হয়েছে। যদি লেখক হিসেবে তার একটা পরিচিত হয়, তখন প্রকাশকেরা আনন্দের সাথে তার বই ছাপতে রাজি হবেন।

আমি মনে করি প্রতিষ্ঠিত লেখক ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদেরও একটা দায়িত্ব আছে। তাদেরকে সবসময় ভালো তরুণ লেখকের খোঁজ করতে হবে। যদি কাউকে খুঁজে পান তাকে দশজনের সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। বইমেলার আগেই যদি এই কাজটি করা যেতো তাহলে আরো ভালো হতো। নতুন ভালো লেখকেরা অনুপ্রেরণা পেতেন, উত্সাহ পেতেন।

আমাদের এতো সুন্দর একটা বইমেলা সেটা শুধু বই ছাপানোর মাঝে আটকে থাকবে সেটা তো হতে পারে না, পাঠক, প্রকাশক, লেখক মিলে বইমেলায় সত্যিকারের যে উদ্দেশ্য সেটাকেও তো সত্যি করে তুলতে হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: