রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে শিক্ষককে হত্যার হুমকি  » «   স্কুলের ঘন্টা বাজালেন রুহানি!  » «   উল্টো পথে প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি: অর্ধশত যানবাহনকে জরিমানা  » «   বিএনপি কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা  » «   সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ: চেয়ারম্যানসহ আসামি ৭  » «   ‘আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান সম্ভব’  » «   রোহিঙ্গাদের গণধর্ষণের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ  » «   অবশেষে রিয়ালের স্বস্তির জয়  » «   সিরিজ বাঁচিয়ে রাখতে চায় অস্ট্রেলিয়া  » «   বালাগঞ্জে গ্রাম আদালত বিষয়ক প্রশিক্ষন সম্পন্ন  » «   তখনও প্রসবকালীন রক্ত ঝরছে তার শরীর থেকে  » «   টাঙ্গাইলে চলছে ভোটগ্রহণ  » «   কিশোরী স্কুলছাত্রীদের যৌনদাসী বানিয়ে রাখেন কিম!  » «   বুদ্ধি কমিয়ে দিচ্ছে যে খাবার  » «   আইফোনের তুলনায় পাঁচ গুণ সস্তা টাইগাফোন  » «  

পরিবেশবান্ধব কৃষি ও স্বাস্থ্যবান্ধব খাদ্য চাই



কৃষিবিদ খুরশীদ আলম

বিগত চার দশকে বাংলাদেশের বড় অর্জন হলো খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব। এই চার দশকে বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার (HYV) এবং রাসায়নিক সার প্রয়োগের কারণে কৃষি খাতে এ বিপ্লবটা ঘটানো সম্ভব হয়েছে।
গত চার দশকে দেশের জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫ কোটি বা তারও বেশি। যদিও রাজনীতিবিদসহ দেশের কিছু বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও বলছে দেশ আজ অভ্যন্তরীণ চাহিদার উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন করছে। তারপরও দেশের সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলে বেরিয়ে এসেছে।
বর্তমান প্রবন্ধটিতে খাদ্য ঘাটতি বা খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হবে না। ইস্যুটা অন্য জায়গায় অর্থাৎ অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের defective বণ্টন ব্যবস্থা দায়ী। প্রবন্ধটির আলোচ্য বিষয়ও এটা না।
বর্তমান প্রবন্ধে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হচ্ছে তা কি ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এবং প্রযুক্তিগুলো কতটুকু পরিবেশবান্ধব। অন্যভাবে বলতে গেলে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলো আমাদের পরিবেশের ওপর কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া রাখছে কিনা? রেখে থাকলে এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে হবে। অপরদিকে ফসল উৎপাদনে যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মানব দেহে ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। এগুলোর জন্য দায়ী কে তা খুঁজে বের করতে হবে এবং সর্বোপরি বেরিয়ে আসার উপায় বের করতে হবে। বর্তমান আলোচনার সম্পূর্ণটাই আমার ৩২ বছর চাকরিজীবনের প্রায় ২৬ বছর ধরে কৃষক সমাজের খুব কাছে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতার বর্ণনা মাত্র।
কলের লাঙল প্রযুক্তির ব্যবহার বনাম জমির স্বাস্থ্য এ দেশে ষাটের দশকের পূর্ব পর্যন্ত ফসল উৎপাদনের কৌশল ছিল প্রকৃতি নির্ভর। গরু এবং কাঠের তৈরি লাঙল দিয়ে জমি চাষ করা হতো। প্রকৃতিগতভাবেই জমি আবাদের জন্য গরু কিংবা মহিষ দিয়ে হাল চাষের সময় গরুর গোবর এবং মূত্র জমিতে পড়ে জৈব সার তৈরি করত যা ফসল উৎপাদনে সহায়ক পরিবেশ হিসেবে বিবেচিত হতো। এ প্রক্রিয়ায় যেহেতু জমিতে জৈব সার তৈরি হতো, সেহেতু এগুলো যেমন জমির স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর ছিল না তেমনি এসব জমি থেকে উৎপাদিত ফসল মানব স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতির কারণ হতো না।
বর্তমানে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটাতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করে সেগুলো সম্প্রসারণ কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খাদ্য চাহিদা মিটে যাচ্ছে।
বর্তমানে যে প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার হচ্ছে তার মধ্যে প্রথম প্রযুক্তি হচ্ছে কলের লাঙল। এ প্রযুক্তিটা উদ্ভাবনের ও ব্যবহারের ফলে দুটি সুবিধা পাওয়া গেছে। প্রথমত, খুব অল্প সময়ে অধিক পরিমাণ জমি হাল চাষ করা সম্ভব এবং দ্বিতীয়ত, একজন মাত্র শ্রমিক ব্যবহার করে কিংবা কৃষক নিজেই তার জমি হাল চাষ করে ফেলছে।
অপরদিকে এ কলের লাঙল ব্যবহারের ফলে দুটো বিপরীত প্রভাব পাওয়া গেছে। প্রথমত, পূর্বে গরু দিয়ে হালচাষ  করাকালীন গরু-মহিষের ত্যাগ করা মলমূত্র জমিতে জৈব সার হিসেবে কাজ করত। আর বর্তমানে কলের লাঙল দিয়ে জমি চাষ করার ফলে জৈব সার প্রাপ্তির পরিবর্তে ডিজেল এবং মবিল পড়ে জমিগুলো ক্রমে উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলতে বসেছে। দ্বিতীয়ত, কলের লাঙল ব্যবহারে শ্রমিক কম ব্যবহারের ফলে বহু কৃষি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এদের জন্য গ্রামে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে এরা কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে এবং শহরগুলোতে জনসংখ্যাধিক্যের কারণে শহরগুলো পরিবেশবান্ধব অবস্থা হারিয়ে ফেলছে। সর্বোপরি এসব উদ্বৃত্ত কৃষি শ্রমিক শহরে এসে অনেকেই মানসম্মত কাজের জোগাড় করতে না পেরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে শহরগুলোর সামাজিক পরিবেশও বিরূপ হয়ে পড়ছে। এত গেল একটি মাত্র প্রযুক্তির প্রভাব অর্থাৎ কলের লাঙলের ব্যবহার।
রাসায়নিক সার প্রযুক্তি : জমির স্বাস্থ্য বনাম মানব স্বাস্থ্য
এবার আসছি রাসায়নিক সারের ব্যবহার। এ প্রবন্ধের প্রারম্ভেই বলেছি যে, পূর্বে কৃষি জমিগুলো গরু দিয়ে হালচাষ করার মাধ্যমে যে পরিমাণ জৈব সার পেত তা বর্তমানে না পাওয়ার ফলে জমির  উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। ফলে জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ানোর জন্য রাসায়নিক সার প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। এ রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে শস্যদানার মধ্যে রাসায়নিক পদার্থের একটা ভিন্ন বা অতিরিক্ত মাত্রা যোগ হচ্ছে। এসব রাসায়নিক সার শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির বা চারা গজানোর জন্য ব্যবহার করা হলেও অতিমাত্রার কারণে মানবদেহে একটা বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।
কীটনাশক প্রযুক্তির ব্যবহার : ফসলের স্বাস্থ্য বনাম মানব স্বাস্থ্য
তারপর হচ্ছে কীটনাশক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রভাব। ফসলে পোকার আক্রমণ হলে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যে কোনো কীটনাশকই বিষ জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ। পোকা বা পঙ্গপালের আক্রমণ এবং রোগবালাই থেকে ক্ষেতের ফসল ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এসব কীটনাশকের ব্যবহার। এখানে একটা বিষয় আমাদের  সবার জানার জন্য উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রতিটা কীটনাশকেরই একটা মেয়াদ আছে। অর্থাৎ ফসলে প্রয়োগের পর কীটনাশকের প্রভাবের কার্যকারিতা শেষ হতে একটা মেয়াদ থাকে। কিন্তু তারপরও উৎপাদিত শস্যের ভেতরে কীটনাশকের অস্তিত্ব রয়ে যায়, যেটাকে আমরা মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রা বলে থাকি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে যে, কোন কোন ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগের পর নির্ধারিত মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বেই ফসল কেটে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ফলে এ ধরনের শস্য কিংবা সবজিগুলোতে অবশিষ্ট কীটনাশকের মাত্রা বেশি পরিমাণ থাকে যা মানব দেহের জন্য ক্ষতির কারণ।
এতক্ষণ আমি ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত কীটনাশকগুলোর মানবদেহের ওপর কিভাবে প্রভাব রাখে তা বললাম। এখন আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলার চেষ্টা করব কেন এমনটা হচ্ছে? অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, কোন ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষক পর্যায় থেকে বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় যে মধ্যস্বত্বভোগী থাকে তারা ফসল বা বিভিন্ন শাকসবজির একটা ভালো দাম পাওয়ার লক্ষ্যে কৃষকদের কোন কোন ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার কীটনাশক ব্যবহারের পারমর্শ দিয়ে থাকে। কারণ যে কোন শাকসবজি বা ফল-ফলাদিতে কোন দাগ থাকলে শহরের বাজারগুলোতে দাম একটু কম পাওয়া যায়। কারণ এমন কিছু ভোক্তা আছেন যারা যে শাকসবজির ওপর কোন দাগ থাকলে সেটা কেনেন না। সুন্দর দাগহীন সবজি বা ফলমূল তাদের শর্তশূন্য পছন্দ। কিছু বাজে কৃষকসহ বাজারজাতকরণের কাজে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীরা এই সুযোগটা নিয়ে থাকে। কারণ তারা শহুরের কিছু ভোক্তার দৃষ্টিভঙ্গিটা জেনে গেছে। কিন্তু শহরের সব ফ্যাশেনেবল ভোক্তারা এটা জানেন না বা জানতে চেষ্টা করেন না যে সুন্দর টসটসে শাকসবজি বা ফলমূলে কি পরিমাণ কীটনাশকের রেসিডিউয়াল প্রভাব অবশিষ্ট থাকে। এর জন্য দায়ী কে? উৎপাদনকারী কৃষক, বাজারজাতকরণে থাকা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী না শহরের ফ্যাশনেবল ভোক্তা? তবে এটা সত্য যে, শহুরে ফ্যাশনেবল ভোক্তাদের চয়েজ এবং এর ফলশ্রুতিতে বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের চাহিদার কারণে কৃষকরা উচ্চমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে। এখানে ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন আসলেই অবস্থা কিছুটা পাল্টে যাবে বলে আমার মনে হয়।
কীটনাশক প্রযুক্তি ব্যবহার বনাম পরিবেশ
এত গেল মানবদেহের ওপর কীটনাশকের প্রভাব। এবার আলোচনা করতে চাচ্ছি পরিবেশ এবং পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কীটপতঙ্গসহ প্রাণিকূলেরই অবদান রয়েছে। এখানে একটি প্রশ্ন, এভাবে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কি ঘটছে? একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বর্ণনা করার চেষ্টা করছি।
ব্যাঙ একটা প্রাণী যাকে আমরা সবাই চিনি। ব্যাঙের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ক্ষেতের পোকামাকড়। কাটনাশক প্রয়োগের ফলে ব্যাঙের প্রধান খাদ্য পোকামাকড় আর থাকছে না। পাশাপাশি অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ব্যাঙের অস্তিত্বও বিলীন হতে চলেছে। আবার কীটনাশক  ব্যবহারের ফলে মৃত পোকামাকড় খেয়ে অনেক পাখি জাতীয় প্রাণী বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আরও গভীর আলোচনায় যাওয়ার দরকার নেই। এতটুকুতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়।
সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার বনাম প্রাকৃতিক ভারসাম্য
এরপর আসছে সেচের ব্যবহার। প্রাকৃতিক কৃষি ব্যবস্থায় শস্য উৎপাদনে নদী-নালা, খাল-বিল কিংবা মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলন করে কৃষিকাজ করা হতো না। কেবল বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করেই কৃষি কাজ অর্থাৎ ফসল উৎপাদনের কাজটা সমাধা করা হতো। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য খাদ্য চাহিদা মিটাতে যেয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হতে থাকে। তার মধ্যে উচ্চফলনশীল জাতের বীজ ব্যবহার অন্যতম।  উচ্চফলনশীল  জাতের বীজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনে  প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। এখন উচ্চফলনশীল  বীজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমেও শস্য উৎপাদন করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজন হয় প্রচুর পানির। সুতরাং শুষ্ক মৌসুমে ফসল উৎপাদনের জন্য নদী-নালা, খাল-বিলের পানির ব্যবহার শুরু হলো। ফলে যা হওয়ার তা হলো। নদীগুলো নাব্য হারাতে থাকল। খাল-বিল গুলো শুকিয়ে যাওয়ার কারণে মৎস্য সম্পদের ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করল। অর্থাৎ মাছ উৎপাদন হ্রাস পেতে শুরু করল। ফলে প্রাকৃতিক উপায়ে মৎস্য চাষ বা মৎস্যসম্পদ আহরণের জায়গায় চাষ পদ্ধতিতে মৎস্য উৎপাদন শুরু হলো। সময়ের ব্যবধানে আরও নতুন নতুন বীজ প্রযক্তির উদ্ভাবন হতে থাকল। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি অর্থাৎ নদী-নালা, খাল-বিলের পানি যখন অপর্যপ্ত হয়ে পড়ল তখন ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে ফসল উৎপাদনের জন্য সেচাবাদ শুরু করা হলো। একদিকে নতুন নতুন বীজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে এবং উচ্চফলনশীল বা হাইব্রিড জাতের বীজ দিয়ে ফসল উৎপাদন করতে প্রচুর পানির চাহিদা বেড়ে যেতে লাগল। পানি উত্তোলনও বাড়তে থাকল।
আর একটি মজার ব্যাপার হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সুপেয় পানির চাহিদাও কিন্তু পাশাপাশি  বাড়তে থাকে। ভূগর্ভস্থ পানিই হচ্ছে পানযোগ্য পানির প্রধান উৎস। অর্থাৎ এভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যেতে থাকে। মাটিতে যে ন্যূনতম রস থাকা প্রয়োজন তা আর রইল না। দেশটাতে মরুভূমিকরণের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
উপরের এই সহজ এবং সরল আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটানো সম্ভব হচ্ছে। বিদেশ থেকে অপেক্ষাকৃত কম শস্য আমদানি করতে হচ্ছে। কৃষি পণ্য আমদানিতে  বৈদেশিক মুদ্রা  কম ব্যয় হচ্ছে। সর্বোপরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অবদান রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে অন্যান্য সেক্টরের উন্নয়ন চাহিদা পূরণে সহায়ক হচ্ছে। কিন্তু দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের অবস্থা কি দাঁড়াচ্ছে? অর্থাৎ নতুন নতুন উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ হুমকির সম্মুখীন। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে কি তাহলে কৃষি খাতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাদ দিতে হবে? না, আমি একথা বলছি না। এটা আমার প্রস্তাব না। এ রকম পদক্ষেপ নেয়া হলে দেশের লোক না খেয়ে মারা যাবে। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খরচ করে খাদ্য আমদানি করতে হবে। অর্থাৎ সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খরচ করে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটাতে হবে। ফলে অন্যান্য সেক্টরের উন্নয়ন চাহিদাগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। বর্তমানে আমরা যে বলছি দেশ মধ্যম আয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ২০২১ সালের প্রত্যাশা অর্থাৎ দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে চাচ্ছি তা আদৌ সম্ভব হবে না। তাহলে প্রশ্নটা আসছে কেন এমনটা হচ্ছে এবং কি করা উচিত কিংবা কিভাবে এই সমস্যাটাকে  মোকাবিলা করতে হবে।
এমনটা কেন হচ্ছে?

কেন এমনটা হচ্ছে? এর উত্তর খোঁজার জন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞের প্রবন্ধ থেকে একটি সংক্ষিপ্ত সার বের করে এখানে উপস্থাপন করার একটু চেষ্টা করা হলো।
ক. কোন নতুন প্রযুক্তি দেশে আনার পূর্বে বা দেশেই উদ্ভাবিত কোন প্রযুক্তি মাঠে সম্প্রসারণের পূর্বে ব্যবহারকারী কৃষকদের জন্য প্রযুক্তিগুলো দক্ষতার সাথে ব্যবহারের যথাযথ সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম নেয়া হয় না। যদিও নেয়া হয়ে থাকে তবে তা বৃহৎ কৃষক সমাজে তুলনায় অপ্রতুল।
খ. সরকারের পাশাপাশি এনজিও এবং প্রাইভেট কোম্পানিগুলোও উন্নত কৃষি প্রযুক্তি আমদানি, উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের কাজে জড়িত রয়েছে। এনজিওগুলো এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু তাদের কাজের পরিধি সীমিত। অর্থাৎ এনজিওগুলো মূলত এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নিয়ে থাকে। অপরদিকে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর আসল আগ্রহ মুনাফা।
গ.  আবার দেখা যায় যে, গ্রামের একজন কৃষক একই জমিতে কয়েক ধরনের ফসল উৎপাদন করে থাকে। তারা কৃষি অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তাদের কাছে বহুমাত্রিক সমস্যার সমাধান চেয়ে থাকে। যা আনেক সময় মাঠ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে দিতে সক্ষম হন না।
উপরের সারসংক্ষেপ থেকে একটি সত্য বেরিয়ে আসছে যে, কৃষকদের অজ্ঞতাটা কাজ করলেও দায়ী কিন্তু কৃষকটি না। প্রযুক্তি আমদানি ও সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতাটা এখানে দায়ী বলে আমার মনে হয়।
উপরের আলোচনা থেকে একটা সত্য বেরিয়ে আসছে যে এক সময় উচ্চফলনশীল প্রযুক্তির ব্যবহারটা তাগিদবোধ থেকেই হয়েছে। কিন্তু দায়বদ্ধতার অভাব, যে কোন প্রযুক্তি মাঠে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে কৃষকদের প্রস্তুত না করা এবং সর্বোপরি প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর একমাত্র মুনাফা অর্জনের আগ্রহটা পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। এই প্রসঙ্গে যে প্রস্তাবটা হচ্ছে তা হলো পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা চাই। অর্থাৎ যেসব প্রযুক্তি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব রাখছে সেই প্রযুক্তিগুলো পরিহার করে ( যে ক্ষতি হয়েছে তা হয়ে গেছে)  পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগুলো কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত করতে হবে।

 

শেষ কথা
এতক্ষণ যে বিষয়টার ওপর আলোকপাত করলাম তা হচ্ছে উৎপাদন পর্যায়ে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব। এবার আলোচনা করব উৎপাদনের পরবর্তী স্তরের গল্প। অর্থাৎ পরিবেশটাকে বিরূপ করছে এমন সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত ফসল, সবজি বা ফলমূল আমরা খাচ্ছি সেগুলো স্বাস্থ্যবান্ধব কিনা? আর যদি স্বাস্থ্যবান্ধব না হয়ে থাকে তবে কিভাবে উৎপাদিত ফসলাদি তার স্বাস্থ্যবান্ধব চরিত্র হারাচ্ছে?
ইদানিং খবরের কাগজ পড়লেই দেখা যাচ্ছে যে, ব্যবসায়ীরা শাকসবজি, ফলমূল এবং মাছ ইত্যাদির পচনরোধ কল্পে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করছে। এসব শাকসবজি এবং ফলমূল খেয়ে মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগের ঝুঁকির আওতায় রয়েছে। এসব রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে ফরমালিন এবং কার্বাইড সর্ব মহলে পরিচিতি লাভ করেছে। ফরমালিন এমন একটা রাসায়নিক পদার্থ যা প্রোটিন জাতীয় দ্রব্যাদির পচন রোধ করে। এজন্য মাছেই এ রাসায়নিক পদার্থটা ব্যবহার করা হচ্ছে বেশি। এভাবে ফরমালিনযুক্ত মাছ খেতে থাকলে মানুষের শরীরে মাত্রাধিক্য ফরমালিন জমা হবে। ফলে জীবাণু এবং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী ওষুধ মানবদেহে কাজ করবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মত ব্যক্ত করে আসছেন। কেবল তা-ই না, অত্যাধিক ফরমালিন জমা হওয়ার কারণে মানুষের মৃত্যুর পরও দেহে পচন ধরবে বলে মনে হয় না। বিষয়টাক এইভাবে একটু দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। একজন মানুষ মারা গেল যার শরীরে মাত্রাধিক্য ফরমালিন রয়েছে। তাকে কবর দিয়ে আসা হলো। কিন্তু মৃত মানুষটার দেহে কিছুতেই পচন ধরছে না। দীর্ঘ সময় ধরে অপচনশীল অবস্থায় রয়ে যাচ্ছে। ফলে যা হবে কবরগুলো রিফিল করা সম্ভব হবে না। তাহলে নতুন নতুন কবরস্থান বানাতে হবে। কৃষি জমি কমার আরও একটা Window Open হবে। অবস্থাটা একটু চিন্তা করুন তো?
এটাতো গেল শাকসবজি ফলমূল এবং মাছ পচন রোধের পদক্ষেপ। আবার ফলমূল পাকানোর জন্য অন্য ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ দুটো পদক্ষেপই রয়েছে ব্যবসায়ীদের হাতে। তাদের ইচ্ছামতো বাজারজাত করছে কিংবা মজুত করে রাখছে। ফলে এসব উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যের মূল্যও তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। এর জন্য উৎপাদনকারী অর্থাৎ কৃষক যে দায়ী না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। দায়ী যারা ব্যবসা করছে তারা। এসব ব্যবসায়ীরা যে বোকার স্বর্গে বাস করছে তাও নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ একজন ফল ব্যবসায়ী ফলে পচন রোধের জন্য রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে বেশি মুনাফা করল। আর মনে মনে ভাবল আমি কিংবা আমার ছেলেমেয়ে তো আর খেল না। আবার সে যখন মাছ কিনে খাচ্ছে সেটা কি খাচ্ছে তা মনে হয় তাদের এখনও বোধগম্য হয়নি। তারা তো আর প্রিন্স কিংবা প্রিন্সেস না যে তাদের খাবার চাটার্ড করা প্লেনে করে সুদূর আমেরিকা থেকে আসে? সুতরাং তাদের বোকা আখ্যায়িত করা ছাড়া কি উপাধি দেয়ার আছে?
লেখক:: সাবেক যুগ্ম পরিচালক (গবেষণা, মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ), বিআরডিবি,

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: