শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপের সুপারিশ কানাডিয়ান দূতের  » «   সালমান খানের সঙ্গে শাকিব খানের তুলনা করলেন পায়েল  » «   বিশ্বকাপ মিশনে নামার আগে মক্কায় পগবা  » «   সিটি নির্বাচনের প্রচারে এমপিরা কি অংশ নিতে পারবেন?  » «   তালিকা অনুযায়ী সবাইকে ধরা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  » «   আমজাদ হোসেনের জার্মানি পতাকা এবার সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার  » «   ভক্তদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে কক্সবাজার ছাড়লেন প্রিয়াঙ্কা  » «   জাপানে বন্ধুর ক্লাবই নতুন ঠিকানা ইনিয়েস্তার  » «   মুক্তামনির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক  » «   ‘ভারত থেকে এক বালতি পানিও আনতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী’-রিজভী  » «   চৌদ্দগ্রামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক বিক্রেতা নিহত  » «   জবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন নেতার ওপর হামলা  » «   নারীর মন-শরীর নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষ আধিপত্য চায়: বিদ্যা  » «   আখাউড়ায় হচ্ছে ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট  » «   ২১ ঘণ্টা রোজা রাখছেন ৪ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান!  » «  

নাটোর-৪ আসনসাংসদ-মেয়র-চেয়ারম্যানের বিবাদ তুঙ্গে, হতাশা-বিভক্তি তৃণমূলেও!



নিউজ ডেস্ক::ব্যক্তি নয়, প্রতীক দেখে দেশের যে কয়টি আসনে ভোটাররা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম নাটোর-৪ সংসদীয় আসন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকী নয় মাসেরও কম সময়। যে সময় নির্বাচনী প্রস্ততির জন্য সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধির কথা, সে সময় অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধে জর্জরিত নাটোর জেলার ‘হেভিওয়েট’ আসন হিসেবে খ্যাত গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটির সরকার দলীয় সাংসদ ও জনপ্রতিনিধিরা।

নির্বাচন যতো এগিয়ে আসছে, ততই গৃহদাহ বাড়ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে। দুইটি উপজেলাতেই বর্তমান সাংসদ সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন স্থানীয় সরকারের দুই শীর্ষ জনপ্রতিনিধি। তারা বিভিন্ন অভিযোগে সাংসদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন। অপরদিকে সাংসদ ও তার সমর্থকরা দলে বিভেদ-বিভাজনের জন্য ওই দুই জনপ্রতিনিধিকে দায়ী করছেন। তাদের দাবী, ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্ব পর্যন্ত সাংসদের বিরোধীতা করা মানে সরাসরি দলের বিরোধীতা করা।

প্রকাশ্যে এমন বিভাজনে হতাশ দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীরা। তাদের দাবী, সাংসদ কুদ্দুসের সাথে দুই জনপ্রতিনিধির বিরোধ বাড়াবাড়ি রকমের পর্যায়ে চলে গেছে। ব্যক্তিগত বিরোধে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, দলীয় কোন্দল এখনই না মিটলে এর সুযোগ নিতে ভুল করবে না বিএনপি।

সম্প্রতি দুইটি উপজেলার পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীর সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। অবস্থাদৃষ্টে, তারাও বিভক্ত। কেউ বর্তমান সাংসদের পক্ষে কেউ তার বিরুদ্ধে। তাদের দাবী, নিজ নিজ নেতারা পাবেন দলীয় মনোনয়ন।

দৃশ্যত তিনটি ভাগে বিভক্ত আসনটির আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। সাংসদ কুদ্দুসের বিরোধীতায় রয়েছেন বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও দলের জেলা কমিটির স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী।
অপরদিকে, সাংসদের নিজ এলাকা গুরুদাসপুরে তার শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছেন গুরুদাসপুর পৌর মেয়র শাহনেওয়াজ আলী মোল্লা। শাহনেওয়াজ ও সিদ্দিক পাটোয়ারী ইতোমধ্যে আসনটি থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দিতার ঘোষণা দিয়েছেন। বিভিন্ন উপায়ে গণসংযোগ করে তারা নিজেদের মতো করে প্রচার চালাচ্ছন ভোটের জন্য।

পাশাপাশি সাংসদ কুদ্দুসের বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত বিরোধী বিভিন্ন অভিযোগ বিশেষ করে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানো ও ২০১৭ সালে বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের উপ-নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থী ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারীকে পরাজিত করতে বিএনপি প্রার্থী রাশিদুল ইসলামকে সহযোগিতা করাসহ অসংখ্য অভিযোগ তুলে ধরছেন।

গত এক মাসে সাংসদের বিরুদ্ধে দুই উপজেলাতেই পালাক্রমে সংবাদ সম্মেলন করেছেন মেয়র শাহনেওয়াজ ও উপজেলা চেয়ারম্যান সিদ্দিক পাটোয়ারী। গত দুই বছরে দুই উপজেলাতেই মোট নয়বার সাংসদ কুদ্দুসকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন দুই জনপ্রতিনিধি ও তাদের সমর্থকরা। শুধু তাই নয়, সাংসদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন নৌকা প্রতীক পাওয়া বড়াইগ্রামের ৬ নং গোপালপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু বক্কার সিদ্দিক, ৭ নং চান্দাই ইউনিয়ণ পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী আতাউর রহমান ও গুরুদাসপুরের নাজিরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আইয়ুব আলী।

তাদের অভিযোগ ছিল, সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস নৌকার বিরোধীতা করে ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন। অভিযোগে তাদের বিজয়ী হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিন প্রার্থী। তাদের আশংকা সত্যি হয়। তিনজনের কেউই নৌকা প্রতীক নিয়ে ওই ইউপি নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। এই ঘটনাকে ইস্যু করেই মূলত সাংসদ বিরোধী বলয় গড়ে উঠেছে দুইটি উপজেলা নিয়ে গড়ে উঠা আসনটিতে।

সাংসদ ও দুই জনপ্রতিনিধি কেন্দ্রিক বিরোধে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। ফলে কর্মীরাও হতাশার মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতির দ্রুত উত্তরণ না হলে সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলে দলের তৃণমূল কর্মীরা আশংকা করছেন।

বড়াইগ্রামের ৬ নং গোপালপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, সাংসদ আব্দুল কুদ্দুসের উপর নিজ দলের নেতাকর্মীদের চেয়েও বেশি ক্ষুদ্ধ সাধারণ মানুষ। তার স্বেচ্ছাচারিতায় তার মতো জনপ্রিয় ও বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে পরাজিত হতে হয়েছে। আগামীতে তাকে মনোনয়ন দেয়া মানে ত্যাগী নেতাকর্মীদের নির্বাসনে পাঠানো।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও গুরুদাসপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, সাংসদ কুদ্দুস একসময় তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও গত কয়েকবছরে দুর্নীতি, আত্নীয়করণসহ বিতর্কিত কর্মকান্ডের মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। গুরুদাসপুর আওয়ামী লীগে তাকে একাধিকবার অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি নৈতিকভাবে নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত নন। তাকে পুনরায় মনোনয়ন দেয়া হলে আসনটি হাতছাড়া হতে পারে।

বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারীর অভিযোগ, সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস ইউপি নির্বাচনের মতই উপজেলা পরিষদের উপ-নির্বাচনে সরাসরি নৌকার বিরোধীতা করে দলীয় সিদ্ধান্তবিরোধী কাজ করেছেন। তবুও তৃণমূলের ভোটে ২৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়লাভ করেন। সাংসদ কোনপ্রকার সহযোগিতা দূরের কথা, রীতিমত বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন তার সাথে। সাংসদ গণবিচ্ছিন্ন, বড়াইগ্রামের মানুষ সাংসদ হিসেবে তাকে আর দেখতে চান না। তারা চায়, আসন্ন নির্বাচনে বড়াইগ্রাম থেকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হোক। সাংসদকে পুনরায় মনোনয়ন দিলে দলের ভরাডুবি ঠেকানো যাবে না।

গুরুদাসপুর পৌর মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শাহনেওয়াজ আলী মোল্লা একই সুরে বলেন, সাংসদ কুদ্দুস বিভিন্ন সময় ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করে হাইব্রিডদের দলে জায়গা দিয়েছেন, তৃণমূলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে মনোনয়ন দিয়ে দলের সুনিশ্চিত বিজয় নস্যাৎ করেছেন। গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রামের মানুষ তার উপর ক্ষিপ্ত। তাকে পুনরায় দলীয় মনোনয়ন দিলে আসনটি হারাতে হতে পারে।

এদিকে সাংসদ আব্দুল কুদ্দুসের পক্ষেও সোচ্চার দুই উপজেলায় তার সমর্থকরা। তাদের মতে, এই আসনটিতে এ যাবৎ কালের সমস্ত উন্নয়নের একচ্ছত্র রুপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য আব্দুল কুদ্দুস। তিনি বারবার এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিপুল ভোটে। আওয়ামী লীগের ‘ধরা’ আসগুলোর একটি এই আসনে কুদ্দুস ছাড়া কোন বিকল্প হতে পারে না আওয়ামী লীগে।

গুরুদাসপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বিপ্লব বলেন, বর্তমান সাংসদ বলিষ্ঠভাবে সভাপতি হিসেবে জেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একইসাথে চলনবিল অধ্যুষিত গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার কাজে ঈর্ষান্বিত হয়েই গুটিকয়েক নেতাকর্মী তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আব্দুল কুদ্দুসকে বারবার ভোট দিয়ে এ আসনের মানুষ সংসদে পাঠিয়েছে এবং আগামীতেও পাঠাবে।

বড়াইগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মিজানুর রহমান মিজান বলেন, সাংসদ আব্দুস কুদ্দুসের নেতৃত্বে আসনটিতে আওয়ামী লীগ সব সময় ঐক্যবদ্ধ। দলের দু’একজন নেতা কখন কি বলল, তাতে কিছুই আসে যায় না। আব্দুল কুদ্দুস দলের পরীক্ষিত নেতা এ আসনের উপযুক্ত কান্ডারী। বারবার দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তার (কুদ্দুস) উপর আস্থা রেখেছেন। তিনি আস্থার প্রতিদানে জয়ই উপহার দিয়েছেন নেত্রীকে। বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুরের মানুষ কখনও তাদের নেতা নির্বাচনে ভুল করেননি, আগামীতেও করবে না।

অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেন, যারা সাংসদের বিরোধিতা করে সংবাদ সম্মেলন করে, তারা দলে অনুপ্রবেশকারী এবং অতীতে বহিষ্কৃত। সারাজীবন অন্যদল করে এখন আওয়ামী লীগ করছে তারা। তারা নৌকায় ভোট দেন আর বলে বেড়ান। আবার তারাই প্রকাশ্যে দলের বিরোধীতা করেন। দলে সুবিধাভোগী সবসময়ই থাকে। যারা বিভিন্ন অন্যায় দাবী করে হতাশ হয়েছে, তারাই সাংসদ বিরোধী অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাদের ষড়যন্ত্র কোন কাজে আসবে না ভবিষ্যতে।

এ ব্যাপারে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনয়ন ও ভোটারদের রায়ে বারবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছি এ আসন থেকে। দলের সভাপতি কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালন করে এসেছি এবং এখনও করে চলেছি। দলকে সাংগঠনিভাবে শক্তিশালী করেছি।

ফলে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে। আজ তাদের দু’একজন অভিযোগ করেন আমার বিরুদ্ধে। তাদের ভিত্তিহীন অভিযোগে কিছু আসবে-যাবে না। ষড়যন্ত্র করে কোন লাভ নাই। নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী) সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন না।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: