মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
সিনেমায় এসে নাম বদলেছেন যেসব নায়ক-নায়িকা  » «   বিতর্কিত পুরস্কারের নিয়তি নিয়ে জাজের প্রতিবাদ, কিন্তু….  » «   বাজারে এলো দেশে তৈরি প্রথম ফুল ভিউ ডিসপ্লের স্মার্টফোন  » «   তদন্ত করে ডিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস  » «   চট্টগ্রামে ঘর থেকে ১৫ ফুট লম্বা অজগর উদ্ধার  » «   চট্টগ্রাম হয়ে এলএনজি নিয়ে মাতারবাড়ি যাবে ‘এক্সিলেন্স’  » «   ‘বিনোদন নগরী’র উদ্বোধন করছেন সৌদি বাদশাহ  » «   চট্টগ্রাম ইন্ডি ফিল্ম ফেস্ট উপহার দিলো ‘দৃশ্যছায়া’  » «   শহীদ ফজলুল হক পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ে পুনর্মিলনী উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত  » «   মিনিটে মেসির আয় ২৫ লাখ টাকা  » «   হাতী, জিরাফ, হিপ্পোর মৃত্যু হবে, বড় প্রাণী হবে ‘গরু’!  » «   ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে বাবার বাড়ি বিক্রি!  » «   পত্নীতলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল ঘোষের মৃত্যু : রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সৎকাজ সমপন্ন  » «   নির্বাচন কমিশনে নূন্যতম সৌজন্যবোধও নেই  ———————– : মোমিন মেহেদী  » «   সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজীব : মৃত্যুর আগে খালার কাছে যা বলেছিল সেই রাজীব!  » «  

নতুন করে বরাদ্দ ৫৪০ একর বনভূমি সরিয়ে নেয়া হবে ২৪ হাজার রোহিঙ্গা



নিউজ ডেস্ক:কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগকিদের মধ্যে ২ লাখ মানুষ ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিতে থাকা ২৪ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে তাদের অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। এ তথ্য জানিয়েছেন কক্সবাজারে কর্মরত অতিরিক্ত শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠিত ‘মিয়ানমার নাগরিকদের মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত’ সমন্বয় সভায় তিনি এ কথা জানান। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন। মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালীর ১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গারা বসবাস। এটিকে বর্তমানে পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বলা হচ্ছে।এ অবস্থা মৌসুমী প্রস্তুতি আমাদের জন্য বড় মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতোপূর্বে জাতিসংঘের শরনার্থী সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষনায় প্রমান হয়েছে, এই এলাকার থাকা দুই লাখ মিয়ানমারের নাগরিক ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের স্থানান্তরের জন্য আমরা প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু প্রধান সমস্যা হচ্ছে ভূমি।

সেখানে যাদের অবস্থান অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসবে চিহ্নিত করা হয়েছে বর্ষা মৌসুমের আগেই তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া না হলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।গত ৩১ মার্চের মধ্যে তাদের অন্যত্র স্থানান্তরের পরিকল্পা ছিল। আমরা কাজও শুরু করেছি। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি।

আমরা আশা করছি, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিলের মধ্যেই তাদের ৪ নম্বর শিবির, ১৭, ১৯ ও ২০ নম্বর শিবিরের বর্ধিতাংশে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।’ সভায় কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কাজী আব্দুর রহমান মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের মানবিক সহায়তা’ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্ষায় আশ্রয় শিবিরগুলোতে যাতায়াত করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

এ অবস্থায় শিবিরের অভ্যন্তরে যাতায়াতের জন্য বেশ কিছু সংযোগ সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সেনাবাহিনীও কিছু সড়ক নির্মাণ করছে। কুতুপালং বাজার এলাকায় ৪৬৮ মিটার দৈর্ঘ্যের, বালুখালীর পানবাজার এলাকায় ৪৮০ মিটার, থাইংখালী-১ এ ১২০০ মিটার, থাইংখালী-২ এ ১৬৫০ মিটার, থাইংখালী-৩ এ ৮৭০ মিটার, থাইংখালী-৪ এ ৪২০ মিটার, থাইংখালী-৫ এ ৯৩৬ মিটার, কুতুপালং শিবিরে ১৮৬৫ মিটার এবং থাইংখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৭০ মিটার সড়ক নির্মাণ করছে এলজিইডি। এছাড়াও ২২ কিলোমিটার মূল সড়কের মধ্যে ৭ দশমিক ৭ কিলোমিটারের কাজ শেষ করেছে সেনাবাহিনী। তারা তিনটি রিং কালভার্টও নির্মাণ করেছে।

সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন বলেন, ‘সামনের বর্ষা মৌসুমে আমাদের অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখি হতে হবে। এখানে আশ্রয় নেওয়া যেসব মিয়ানমারের নাগরিক ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে তাদেরকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এখানে কর্মরত আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য মোটরসাইকেলের মত যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা যদি করে দিতে না পারি, আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের

নিয়ন্ত্রনের বিষয়টি যদি আমরা নিশ্চিত না করতে পারি তাহলে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।সুতরাং এখানে আরও চেকপোষ্ট দরকার। সেই সাথে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যও বৃদ্ধি করা দরকার। সেটা কিভাবে করা যায় তাও গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, সেখানে পল্লী বিদ্যুতের যে খুঁটি দেওয়া হয়েছে সেগুলো যেন টেকসই হয়। অন্যথায় খুটিগুলো আশ্রয় শিবিরে পড়ে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিতে নতুন করে আরও ৫৪০ একর বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রথমে তিন হাজার একর ও পরে ২ হাজার ৮শ’একর বনভূমি রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয়েছিল। নতুন করে বরাদ্দকৃত জমিতে কয়েকদিনের মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গা বসতিগুলো উচ্ছেদ করে তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।

কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি যে, সামনে বর্ষা মৌসুমে বন্যা, ভূমি ধস, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এতে দুর্যোগে পড়তে পারে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা। তাদের সরিয়ে নিতে আরআরআরসি’ ‘আওএম’ ‘ইউএনএইচসিআর’ সহ বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে’। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পশ্চিম পাশেই এ জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকায় ইতোমধ্যেই লাল পতাকা ও বসতিগুলোতে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত এসব রোহিঙ্গা বসতিগুলো খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সরিয়ে বনবিভাগের নতুন করে বরাদ্দকৃত জমিতে সরিয়ে নেয়া হবে।’

মো. কামাল হোসেন আরও বলেন, ‘নতুন করে বরাদ্দকৃত বনবিভাগের এই জমিতে জাতিসংঘের ‘ইউএনডিপি’ ও ‘ইউএনএইচসিআর’ সহ দাতা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে পাহাড়ের মাটি সমান করার কাজ চলছে। যেন এসব রোহিঙ্গা বসতিগুলো সেখানে সরিয়ে নেওয়া যায়।’

কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসতিগুলো এপ্রিল মাসের শেষের দিকে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্ষায় ভূমি ধস ঠেকাতে তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে সেখানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সুনির্দিষ্ট মডেলে ঘরবাড়ি ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়েছে।’

বৃষ্টির মৌসুম নিয়ে আতঙ্কে আছেন রোহিঙ্গারাও। উখিয়া কুতুপালং মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জাহেদা বেগম নামে এক রোহিঙ্গা নারী জানান, তিনি পাহাড়ে কখনও বসবাস করেনি। বাধ্য হয়ে তাকে পাহাড়ের ঢালুতে ঘর করতে হয়েছে। তার প্রতিরাতে ভয় লাগে যদি ঘরটা ভেঙ্গে পাহাড়ের নিচে পড়ে যায়।

একইভাবে আলী আহমদ নামে আরেক রোহিঙ্গা জানান, বৃষ্টি পড়লে তারা কোন অবস্থায় পড়ে তা বুঝতে পারছেনা। তার ধারণা পাহাড়ে থাকা নড়বড়ে সব ঘরবাড়ি ভেঙ্গে পড়বে। কারণ পাহাড়ের মাটি গুলো নরম।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো হয়। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। জানুয়ারিতে সম্পাদিত ঢাকা-নেপিদো প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশের পাঠানো প্রথম ৮ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা নিয়েই শুরু হয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সংস্থা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, রাখাইন এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক ও নিরাপদ হতে হবে। তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে নিরাপদে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে উখিয়া-টেকনাফের পাহাড় ও তার পাদদেশে।

গত ২৪ আগস্টের আগ পর্যন্ত উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের লেদা নামে দুইটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থাকলেও বর্তমানে ১২টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা অবস্থান করছে। এসব রোহিঙ্গা ক্যাম্প তৈরী করা হয়েছে পাহাড় কেটে। তারা নিজেরাই প্রতিনিয়ত পাহাড় কেটে তৈরি করছে ঘরবাড়ি। ফলে বৃষ্টি হলে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: