বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
বিএনপির বিরুদ্ধে গায়েবি মামলার প্রমাণ নেই : আমু  » «   অংশ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ইইউ  » «   কমলগঞ্জে ট্রাক চাপায় তরুণী নিহত,চালক পালাতক  » «   বি. চৌধুরীর চায়ের দাওয়াতে যাচ্ছে ন্যাপ–এনডিপি  » «   নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল: ইসি সচিব  » «   ঈশ্বর, মৃত্যু-পরবর্তী জীবন ও স্বর্গ নিয়ে যা ভাবতেন স্টিফেন হকিং  » «   আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক  » «   সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির দৃষ্টান্ত: এক উঠোনে মসজিদ-মন্দির  » «   খাশোগি হত্যা: যুক্তরাষ্ট্রকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা দিল সৌদি  » «   দুর্গাপূজা যেভাবে হলো হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব  » «   সিলেটে ফোনে কথা বলা অবস্থায় যুবকের হঠাৎ মৃত্যু  » «   ইরান কখনো পরমাণু বোমা বানাবে না: রুহানি  » «   সিলেটে সমাবেশের অনুমতি পেয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট  » «   বাংলাদেশে আরো সৌদি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী  » «   কানাডায় প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি শুরু, ক্রেতাদের ভিড়  » «  

ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা : চুয়াডাঙ্গায় ৪০ গডফাদারের নিয়ন্ত্রণে চলছে মাদক ব্যবসা



নিউজ ডেস্ক::চুয়াডাঙ্গায় কোন ভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না ইয়াবা-ফেনসিডিলের রমরমা ব্যবসা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যেই অভিযান চালায়। ছোটখাটো কিছু চালানও আটক করে। তারপরও যেন অপ্রতিরোধ্য মাদক ব্যবসায়ীরা। জেলার চারটি উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় অর্ধশত স্পটে চলছে মানব-জীবন ধ্বংসকারী এই মাদক ব্যবসা।

সূত্রে জানা যায়, জেলার ছোট-বড় প্রায় ৫০০ জন মাদক ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করছে মাদকের এই সাম্রাজ্য। এদের মধ্যে কাড়ি কাড়ি টাকা বিনিয়োগ করে গডফাদার হিসেবে কাজ করছেন প্রায় ৪০ জন। যাদের অধিকাংশই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ থেকে ৬ মাস আগেও চুয়াডাঙ্গায় ইয়াবার যোগান দিতো কক্সবাজার ও ঢাকার দুটি বড় সিন্ডিকেট। আর ফেনসিডিল আসত প্রতিবেশি দেশ ভারত থেকে। ইতিমধ্যে চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির আওতাধীন ২৪টি সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ইয়াবা কারখানা গড়ে তুলেছে সে দেশের মাদক ব্যবসায়ীরা। আর এতে করে খুব সহজেই সীমান্ত পেরিয়ে অনায়াসে চুয়াডাঙ্গায় ঢুকছে ফেনসিডিলের পাশাপাশি মরণনেশা ইয়াবা।

একাধিক সূত্র বলছে, মূলত চুয়াডাঙ্গার ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪০ জন গডফাদার। যাদের সবাই সমাজের বিত্ত ও প্রভাবশালী। এছাড়া তাদের রাজনৈতিক সম্পর্কও অনেক বড়। এরাই মরণঘাতী নেশাজাত দ্রব্যটি বাজারজাতের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

রাজনৈতিক দাপট, প্রশাসনিক ক্ষমতা আর মাদকের অর্থে পরিচালিত এ ইয়াবা-ফেনসিডিল চক্রের প্রতাপ অনেকটা আকাশছোঁয়া। এ কারণে সিন্ডিকেটের সদস্যরা সব সময়ই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া ভারত সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে চুয়াডাঙ্গায় ঢুকছে মরণনেশা ইয়াবা। এক্ষেত্রে দু’দেশের সীমান্তরক্ষীদের কিছু অসাধু সদস্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা জেলার জীবননগর উপজেলার বেনীপুর, হরিহরনগর, রাজাপুর, সদর উপজেলার শিংনগর, দামুড়হুদা উপজেলার মুন্সিপুর, নিমতলা, জয়নগর, সুলতানপুর, কামারপাড়া, বাড়াদী, হুদাপাড়া, ফুলবাড়ী, ঠাকুরপুর, ও পীরপুরকুল্লা সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করছে। সীমান্ত পার হওয়ার পর বিভিন্ন হাত ঘুরে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ইয়াবা। এক্ষেত্রে মাদকের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে জেলার দুটি উপজেলার ৭টি রুটকে। মাদকের সবচেয়ে বড় গ্রাম সদর উপজেলার আকুন্দবাড়িয়া গ্রাম। মূলত এ গ্রাম থেকেই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারা দেশে মাদক।

চুয়াডাঙ্গার ইয়াবা সিন্ডিকেটের আদ্যপ্রান্ত অনুসন্ধানের সময় কথা হয় চুয়াডাঙ্গা শহরের অতি পরিচতি মুখ ‘র’ আদ্যক্ষরের এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর সাথে। তিনি জানান, মূলত এই ব্যবসায় একবার ঢুকলে বের হওয়া কঠিন। একে তো কাঁচা টাকা, তাছাড়া সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে বের হতে চাইলেও নিজেদের ক্ষতির আশঙ্কায় শীর্ষ গডফাদাররা আটকে দেয় নানা বেড়াজালে।

তার মতে চুয়াডাঙ্গা জেলার চারটি উপজেলায় ছোট বড় মিলে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৫ শতাধিকের উপরে। এরপর আবার তাদের নিযুক্ত ফেরীওয়ালা আছে আরো প্রায় তিন শতাধিক। এই ব্যবসায়ীর মতে, তাদের প্রধান টার্গেট উঠতি বয়সের ছেলেরা।

সরকারি দুটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম দিকে চুয়াডাঙ্গার মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় একটি তালিকা করে। এই তালিকায় স্থান পায় জেলার ১১৯ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম। গডফাদার ও হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল হিসেবে স্থান পায় ৪ জন। এদের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজী আলী আজগরের ছোট ভাই আলী মুনসুর বাবু, সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ সহচর মনোহরপুর ইউপি সদস্য সোহরাব হোসেন সুরোদ্দিন, যুবলীগ নেতা দর্শনা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জয়নাল আবেদীন ওরফে নফর ও সদ্য বিজয়ী হওয়া স্থানীয় সরকারের এক জনপ্রতিনিধির নাম। তালিকাটিতে পুলিশ ও বিজিবির ১৬ জনসহ পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের নাম ছিল।

সূত্রটি বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে জেলার ১১১ জনকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার ১৬ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে ৩৪ জনকে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম আসার বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র বলছেন সাংসদের ভাই আলী মুনসুর বাবু। তিনি বলেন ‘আর কয়েক মাস পরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমার ভাই সাংসদ আলী আজগর টগর তার নির্বাচনী এলাকায় স্মরণকালে ব্যাপক উন্নয়ন করার কারণে জনপ্রিয়। তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দলের ভিতরে বাইরে ষড়যন্ত্র চলছে। যারা তালিকা প্রণয়ন করেছেন, তারা প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাকে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখিয়েছেন।

জেলা পুলিশ দাবি করছে, অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তাদের। মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ হচ্ছে দাবি করে সূত্রটি বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে চুয়াডাঙ্গায় মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিলো ৪৩০ জন। পুলিশের অভিযানে সেটি বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ২১৫ জনে। মূলত চারটি তালিকা যাচাই-বাচাই করে নতুন এই তালিকাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই তালিকা ধরেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিনজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ছোট বড় মিলে প্রায় শতাধিক।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমানের মতে, চুয়াডাঙ্গাতে এখনো বড় কোন মাদক ব্যবসায়ী আটক হয়নি। যারা আটক হচ্ছে তারা ছিঁচকে পর্যায়ের। তিনি দাবি করেন- মাদকের গডফাদার বা হোয়াইট কালার ক্রিমিনালরা আইনের আওতায় না আসলে কোন অভিযানই কাজে আসবে না।

জেলা পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কোন আপোষ নাই। মাদক ব্যবসায়ীরা যত বড় শক্তিশালীই হোক আমাদের কাছে তাদের একটাই পরিচয়, তারা ক্রিমিনাল।

মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গিকার করে জেলা পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছি। বাকিদেরকেও গ্রেফতারে প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। চুয়াডাঙ্গা জেলা মাদকের শিকড় নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: