মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
আমার কিছু হলে দায়ী আপনারা মামা-ভাগ্নে: সিইসিকে গোলাম মাওলা রনি  » «   ভুলভ্রান্তি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন: শেখ হাসিনা  » «   মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য অসত্য: সিইসি  » «   ভোটের ফলাফল প্রকাশে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ  » «   ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় মইনুলের জামিন  » «   বাংলাদেশের বিজয় দিবসকে অবজ্ঞা শেহবাগের!  » «   সারাদেশে ১ হাজার ১৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন  » «   প্রার্থিতা নিয়ে রিট খারিজ, নির্বাচন করতে পারবেন না খালেদা জিয়া  » «   জামায়াতের ২২ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলে রুল  » «   সিলেটে প্রাধান্য উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার  » «   বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করছেন ফখরুল  » «   আপিলেও ভোটের পথ খুলল না ইলিয়াসপত্নী লুনার  » «   যেসব ‘বিশেষ’ অঙ্গীকার থাকছে আ. লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে  » «   আ.লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছেন শেখ হাসিনা  » «   সিলেটে বিএনপি নেতাকর্মীদের মারধর ও ধরপাকড়ের অভিযোগ  » «  

কে এই কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি?



বিচিত্র ডেস্ক::নাচের আবেদনময় মুদ্রায় সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন তিনি। পানের আসরে আসরে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম। ১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর রাতটা যেন ওলন্দাজ এই নৃত্যশিল্পীর কাছে অন্য রকম মনে হয়েছিল। সেই রাতে তাঁর নাচ দেখতে চাননি কেউ। তিনিও প্রস্তুত ছিলেন না নাচের জন্য।

স্রেফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, নগ্ন নাচ নয়, আজ তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। রাত শেষ হতে আর একটু বাকি। ফ্রান্সের সেন্ট লাজার কারাগার থেকে সেনাবাহিনীর একটি ধূসর গাড়িতে করে মাতা হারিকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের উপকণ্ঠে। শহরের সুনসান পথে তাঁর সঙ্গী মাত্র তিনজন- দুজন নান ও তাঁর আইনজীবী। সেখানে একটি খুঁটি পোঁতা হয়েছে। তার পাশে হাত বেঁধে দাঁড় করানো হলো মাতা হারিকে। ৪১ বছর বয়সী এই নৃত্যশিল্পীর পরনে লম্বা কোট, মাথায় হ্যাট। নিজের মৃত্যুকে চোখে দেখতে চান, তাই চোখ বাঁধতে দিলেন না তিনি। ইশারায় জানিয়ে দিলেন, এখন প্রস্তুত।

গন্তব্যস্থলে তিনি যখন পৌঁছালেন তখন সময় সবে সকাল সাড়ে ৫টার চেয়ে একটু বেশি। তাকে দাঁড় করানো হলো ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ১২ ফরাসি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে। চোখ বাঁধার জন্য সাদা কাপড় দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু তিনি নিতে চাইলেন না। ‘এটা কি পরতেই হবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।

যখন তার দিকে বন্দুক তাক করে সৈন্যরা, তখনও তাদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়েছিলেন তিনি। তার এক হাত বেঁধে ফেলা হয়। অপর হাতে তিনি নিজের আইনজীবীর দিকে হাত নাড়েন। পরমুহূর্তেই সৈন্যদের রাইফেল গর্জে উঠে। পায়ে লাগে গুলি। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে রিভলবার বের করে তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

অথচ, এক দশক আগেও, এই নারীর পায়ের তলায় ছিল ইউরোপের বহু রাজধানী। তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এক ‘রূপসী’। ভিনদেশি নগ্ন নাচের আবেদনে কাবু করে রেখেছিলেন কতশত মন্ত্রী, জেনারেল আর শিল্পপতিদের। ঘটনার দু’বছর আগেও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল তার। প্যারিসে এক প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটান তো, পরেরদিন হেগ শহরে আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। রীতিমত আন্তর্জাতিক ‘সেক্স সিম্বল’ তিনি। নামেমাত্র পোশাক পরে নাচতেন। প্যারিসে তার নগ্ন নাচের আসর ছিল যেন তৎকালীন ইউরোপিয়ান অভিজাতদের ছোটখাটো সম্মেলন। মাতা হারি- এই এক নামে তাকে দুনিয়া চিনতো।

কিন্তু, এরপরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পাল্টে গেল তার চেনাজানা জগত। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন আগের মতোই ইউরোপের ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বরং তাকে মৃত্যুদণ্ড পেতে হলো। তার অপরাধ? জার্মানির পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জার্মান প্রভুদের কাছে সরবরাহ করা। লুফে নিল পত্র পত্রিকাগুলো। তাকে দায়ী করা হলো হাজার হাজার মিত্রপক্ষীয় সৈন্যর মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

কিন্তু আজ শত বছর পর ফরাসি সরকার যেসব নথিপত্র অবমুক্ত করেছে, তাতে এক ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠে। তার মৃত্যুর এত বছর ধরে তার সঙ্গে লেগে ছিল ডাবল এজেন্ট হওয়ার কলঙ্ক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ছিলেন স্রেফ একজন বলির পাঠা।

তার আসল নাম কিন্তু মাতা হারি নয়। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে। বাবা-মা নাম রাখেন মার্গারেথা জেল্লে। মাতা হারি নামটা কেন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ তত্ব। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়, এই নামের অর্থ ‘দিনের চোখ,’ অর্থাৎ সূর্য। আবার হারি নামে এক হিন্দু দেবতাও আছেন। তার আগে মাতা শব্দটিও লাগিয়ে থাকতে পারেন। দুই তত্বেরই ভিত্তি আছে। নিজেকে অনেক সময় তিনি জাভানিজ (ইন্দোনেশিয়ার একটি অঞ্চল) প্রিন্সেস বলে পরিচয় দিতেন। কখনও আবার ভারতের মন্দির নর্তকির মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কখনই তিনি বলতেন না, তার জন্ম আসলে নেদারল্যান্ডে।

আর নেদারল্যান্ডে তার জন্মস্থান লিউওয়ার্ডেনের ফ্রাইজল্যান্ড মিউজিয়ামে তাকে নিয়ে শনিবার থেকে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে তার বিচারের অনেক নথিপত্র অবমুক্ত করা হয়। তার ব্যক্তিগত ও পারবারিক কয়েকটি চিঠিও প্রকাশ হয়। সবই আছে প্রদর্শনীতে। এসব নথিপত্র একসাথে মেলালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত এই গুপ্তচরের আরও বহু পরিচয় আছে।

ফ্রাইজল্যান্ড জাদুঘরের কিউরেটর হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন, ‘আমরা আসলে তার জীবনটা বুঝতে চেয়েছি। একজন বিশাল তারকা হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে। একজন শিশু হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে যিনি শুধু নর্তকিই ছিলেন না, বা গুপ্তচরই ছিলেন না। আমরা চাই তার পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে।’

তার জীবন ছিল প্রচণ্ড ঘটনাবহুল, আর মর্মান্তিক। জন্ম হয়েছিল বেশ ধনী এক পরিবারে। কিন্তু তিনি যখন কিশোরী, অকস্মাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসারধর্ম ত্যাগ করেন তার পিতা। একলা মায়ের কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে সেই মা-ও মারা যান। অগত্যা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় হয় তার। ১৮ বছর বয়সে গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ জন ম্যাকলিওডের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই লোকের বয়স ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ। তার সঙ্গেই গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক সামরিক ঘাঁটিতে ৪ বছর ছিলেন তিনি। তখনই জাভানিজ ভাষায় তার হাতে খড়ি।

তাদের দাম্পত্য জীবনকে ঝঞ্ঝাটময় বললে কম বলা হয়। প্রতিনিয়ত তিনি অকথ্য নির্যাতন সইতেন স্বামীর কাছ থেকে। নিজের ৩ বছর বয়সী ছেলেটাকে মারা যেতে দেখেন তিনি। সম্ভবত, গৃহকর্মীর দেওয়া বিষের কারণে। পরে এক মেয়ে হয় তার। ৪ বছর পর হল্যান্ডে ফিরলে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান মার্গারেথা (তার আসল নাম)। কিন্তু মেয়ের খরচ বহন করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে তিনি চলে যান প্যারিসে। মেয়েকে রেখে যান স্বামীর কাছে। নিজের এই মেয়েকে তিনি সবসময়ই মিস করতেন।

পরে প্যারিস থেকে নিজের প্রাক্তন স্বামীর এক কাজিনকে লেখা চিঠিতে মার্গারেথা জানান যে, সেখানে তিনি এক থিয়েটারে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে নামতে হয়েছে পতিতাবৃত্তিতেও। তিনি লিখেন, ‘ভেবো না যে, আমি আসলেই অনেক খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমি বাধ্য হয়েছি এ পথে নাম লেখাতে।’

তিনি নাকি এ-ও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, যেসব নারী সংসার ছেড়ে পালান তারা পরবর্তী ঠিকানা হিসেবে প্যারিসকে খুঁজে পান।’ নিজের এই নর্তকি আর অভিনয় জীবনেই তিনি বেছে নেন ‘মাতা হারি’ নাম, যেটি পরে তার আসল নামকেও ছাপিয়ে যায়। এই জীবনেই তিনি অনেক অর্থ আর যশের মালিক হন। ভাবা হয়, জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি মিলিয়নিয়ারও ছিলেন।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, সেটি না থাকলেও, আজও তাকে মানুষ স্মরণ করতো। গত শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরোপজুড়ে তার যেই পরিচিতি ছিল, তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকতেন। ‘স্ট্রিপিং’ (নগ্ন নাচ)-কে তিনিই কমবেশি নাচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে তার ছবির অ্যালবাম আছে। তার ছবি সম্বলিত সংবাদপত্রের স্তূপ এখনও আছে। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপের সেলেব্রেটি ছিলেন।’

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনকেন্দ্রীক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ই। অথচ, আজ এত বছর পর জানা যাচ্ছে যে, তিনি জার্মানদের কাছে তেমন কোনো তথ্যও দেননি। যেমন, হয়তো তিনি বলতেন যে, এই বসন্তে হামলা চালাতে পারে মিত্রবাহিনী। কিন্তু এই তথ্য সবারই জানা ছিল।

অথচ, হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার পরিচিতি প্রাপ্তি, জার্মানি ও ফ্রান্স-উভয় পক্ষের সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, আর যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপজুড়ে ঘোরাঘুরি- এ সবই তার বিপক্ষে কাজ করেছে। আর তার জীবনযাপনের ধরণ নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে যায়নি।

এতদিন ধরে অনেক ইতিহাসবিদই তাকে নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপক্ষে গিয়ে তার পক্ষালম্বন করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে আসলে বলি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধের পর নিজেদের অজস্র ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে একজন জুতসই গুপ্তচর দরকার ছিল ফরাসিদের, যাকে কিনা শূলে চড়ানো যাবে। আর নষ্টা চরিত্রের মাতা হারি এক্ষেত্রে ছিলেন ‘পারফেক্ট’ বলি।

ফরাসি সেনারা এই ভয়েও ছিলেন যে, মাতা হারি ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার মেলামেশার কথাও ফাঁস করে দিতে পারেন। এদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ জেনারেলও ছিলেন। এ কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

আবার এ-ও সত্য যে, ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে অনেক ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, ফরাসি গোয়েন্দারা আগেই বৃটিশদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাকে জার্মান গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে। হাতেনাতে ধরতেই তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

কিন্তু পরবর্তীতেও এটাও জানা যায় যে, বৃটিশরা যেসব কারণে তাকে সন্দেহ করেছিল, তার কোনো যুক্তিযুক্ততা ছিল না। বৃটিশ গোয়েন্দারা তাকে লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বলা হয়, প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও, ‘তিনি একজন সাহসী ধাঁচের মহিলা, যাকে সন্দেহ থেকে ফেলা যায় না।’

স্পেনের মাদ্রিদে জার্মান সামরিক অ্যাটাশে আর্নল্ড ভন কালের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এই আর্নল্ডই নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাতা হারিকে নিজেদের গুপ্তচর হিসেবে ইঙ্গিত দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান। এই টেলিগ্রাম ফরাসি কর্মকর্তাদের হাতে যায়। এটিই ছিল মাতা হারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদই একে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

তাদের যুক্তি, ফরাসিরা যে জার্মান টেলিগ্রামে আড়ি পাততে পারেন, সেটা জার্মানরা অনেক আগ থেকেই জানতো। তাহলে, এমন সংবেদনশীল তথ্য টেলিগ্রামে কেন পাঠিয়েছিলেন আর্নল্ড ভ্যান? কারণ, তিনি চেয়েছিলেন যে, এই চিঠি ফরাসিদের হাতে পড়–ক। আর তারা এই চিঠির ভিত্তিতে নিজেদের গুপ্তচরকেই ফাঁসি দিয়ে দিক। হয়েছেও তাই।

আবার অনেকে বলেন, যেই টেলিগ্রামের কথা বলা হয়, সেটির অনুদিত অংশই প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে। সেটির জার্মান ভাষায় লেখা মূল কপি কোথায়? কেউ কি তবে, এসব জালিয়াতি করে বানিয়েছে মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য?

তবে মামলার কৌঁসুলির কিছু নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, মাতা হারি নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ১৯১৫ সালে যুদ্ধ চলাকালে হেগ শহরে জার্মানরা তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি যুদ্ধে আটকা পড়ে ফ্রান্সে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। তখনই আর্মস্টারডামে জার্মান এক কূটনীতিক ফ্রান্সে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার প্রস্তাব দেন। উপায় না পেয়ে তিনি রাজি হন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মিত্রবাহিনীর প্রতিই তার আনুগত্য ছিল সবসময়। ফরাসি গোয়েন্দারা যখনই তার সাহায্য চেয়েছে, তখনই তিনি এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এই যুক্তি ধোপে টেকেনি।

চরবৃত্তির অভিযোগে ১৯১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্যারিসের এক হোটেল থেকে মাতা হারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে বন্দী করে রাখা হয় সেন্ট লাজার কারাগারে। শেষ জিজ্ঞাসাবাদে মাতা হারি স্বীকার করেছিলেন, জার্মানিরা ১৯১৫ সালে তাঁকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ করেছিল। তবে তিনি আসলে মিত্রবাহিনীর প্রতি অনুগত ছিলেন। জার্মানিদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে কেটে পড়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করতে পারেননি তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যেরও প্রমাণ হয়নি। তবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন রহস্যময়ী এই নারী।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলছিলেন, ‘উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল মাতা হারির। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন, নাচতেন। এমনকি একসঙ্গে থাকতেনও। অথচ, যুদ্ধের সময় যখন তিনি বিপদে পড়েন, ওই কর্মকর্তারাই তার বিরুদ্ধে চলে যান। এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে নিশ্চয়ই তার কষ্ট হয়েছিল।’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কেউই মাতা হারির মৃতদেহ দাবি করতে আসেনি। তাই প্যারিসের এক মেডিকেল কলেজে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এটি শিক্ষার্থীদের ব্যবচ্ছেদ শেখাতে ব্যবহৃত হতো। তার মাথার কঙ্কাল অবশ্য অ্যানাটমি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ২০ বছর আগে জাদুঘরে জিনিসপত্রের গণনা চলাকালে দেখা যায়, কঙ্কালটি নেই। ধারণা করা হয়, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: