শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
২৪ ডিসেম্বর মাঠে নামছে সেনাবাহিনী, থাকবেন ম্যাজিস্ট্রেটও  » «   ইন্টারনেটে ধীর গতি ও মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী  » «   প্রার্থিতা নিয়ে শুনানি: আদালতের প্রতি খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের অনাস্থা  » «   আওয়ামী লীগ ১৬৮ থেকে ২২০ আসনে জিতবে: জয়  » «   সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনার মনোনয়ন স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট  » «   আম্বানি কন্যার বিয়েতে নাচলেন হিলারি ক্লিনটন [ভিডিও ]  » «   সিলেট-১ আসনে ধানের শীষের প্রচারণার একসঙ্গে মুক্তাদির-আরিফ  » «   সহিংসতার ঘটনা খতিয়ে দেখতে সিইসির নির্দেশ  » «   ‘ইডিয়ট’ লিখে গুগলে সার্চ দিলে কেনো আসে ট্রাম্পের ছবি?  » «   বিশ্ব ভ্রমণ করবে বাংলাদেশের প্রথম বিদ্যুৎচালিত গাড়ি  » «   খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরব ছাড়পত্র পাবে না: নিক্কি হ্যালি  » «   গুগলে সবচেয়ে বেশি খোঁজ খালেদা ও হিরো আলম  » «   আস্থা ভোট, নেতৃত্বের পরীক্ষায় উতরে গেলেন তেরেসা মে  » «   ফোনালাপ ফাঁস: খন্দকার মোশাররফের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ  » «   নির্বাচনে এজেন্ট পাওয়া নিয়ে চিন্তায় বিএনপি  » «  

কাছ থেকে দেখা: বাউল সাধক ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদ



প্রদীপ মল্লিক::
বাউল সাধক ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদ বাউল জগতে আর লোকগানের জগতে এক কিংবদন্তী নাম। হাজার হাজার গান লিখে, সুর করে, নিজে গেয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।বাংলা লোক গান বা বাউল গানের জগতে যাদের নাম সমীহ আর সম্মানের সঙ্গে নেয়া হয়, তাদের মধ্যে ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদ একজন। এক সময় মালজোড়া গানের আসরে ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদের জুড়ি ছিলো না।

মালজোড়া গানে তাঁর সাথে পালা করেছেন ফকির কবি জ্ঞ্যানের সাগর বাউল দুর্বিন শাহ,বাউল শাহ আব্দুল করিম, মনিবুর রহমান সরকার, মুজিবুর রহমান সরকার,বাউল অন্নদা রঞ্জন দাস, শেফালী ঘোষ, আবেদ আলীসহ দেশের বড় বড় বাউলরা। রাতব্যাপি হয়েছে এসব পালা গানের আসর, যা আজ নাই বললেই চলে।

গানের গলা, গায়কী, গানের কথায়, সুরে, আর পরিবেশনায় আর্থিক দিক থেকে আর পরিবেশনার দিক থেকে বাউল গান কে নিয়ে গিয়েছেন হাওর থেকে মানুষের ড্রয়িং রুম পর্যন্ত। কিন্তু জীবনের প্রায় ১৫ বছরের অধিক সময় তিনি রয়েছেন দেশ ছেড়ে প্রবাসে।কিন্তু প্রবাস জীবন ও তাকে তাঁর গান থেকে, তাঁর নীতি থেকে তাকে এক বিন্দু সরাতে পারে নি।

প্রবাসে থেকেও তিনি নিয়মিত জন্ম দিয়েছে শত শত বাউল গান আর তাঁর কন্ঠের মাধুর্য দিয়ে তিনি তা প্রকাশ করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়। এখনো গান নিয়েই পড়ে আছেন ধ্যানে।এবার আসি কিছু অন্য প্রসঙ্গে, লোক গানের প্রতি ভালোবাসা থেকে আর লোক গান সংগ্রহ করার অভিপ্রায় থেকে আমি উনার কিছু গান নিয়ে নাড়াচাড়া করি,উনার গান নিয়ে নাড়াচাড়া করেই জানতে পারি যে, উনার গানের কথাগুলা অন্য ১০ জন বাউল কবি থেকে কিছুটা ভিন্ন,গানের কথার ওজন ও অনেক বেশি।ব্যাস, শুরু হয়ে গেলো উনার গান নিয়ে আমার ঘাটাঘটি।

সাহায্য নিতে শুরু করলাম বাউল সাধক ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদ সাহেবের একনিষ্ট ভক্ত শিল্পী হায়দার রুবেলের। গভীর রাতে ছুটতে শুরু করলাম বিভিন্ন বাউল মেলা আর উরস শরীফে।সারা রাত নির্ঘুম থেকে উনার গান সম্পর্কে ধারণা নিতে থাকলাম। কারণ আমাকে উনার গান গাইতেই হবে, আর আমার নীতি হলো যার গান গাইবো তাঁর গান জেনে, শুনে, বুঝে আর ধারণা নিয়েই গাইতে হবে।

এর কিছুদিন পরেই ডাক আসলো বাংলাদেশের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল দেশ টিভির প্রিয়জনের গান অনুষ্ঠান থেকে। আমাকে ৩ ঘন্টার লাইভে গাইতে হবে সিলেটের গান। ভাবলাম, সবাই যে গান করেন তা আমি গাইবো না, হায়দার রুবেল কে দিয়ে এমন একটি গান সংগ্রহ করালাম যে গান একমাত্র উনি ছাড়া

দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি কোথাও গান নি। গাইলাম “সাধে সাধে প্রেম করিলাম প্রান বন্ধুয়ার সনে গো এখন চিন্তা জাগে মনে”। গেয়েছিলাম ভয়ে ভয়ে কিন্তু এই গান যে এতো সাড়া ফেলবে ভাবিনি।এইভাবে একে একে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতে চেষ্টা করতাম উনার অপ্রকাশিত কিছু গান।গাইতাম নিজের মন থেকে কিন্তু বাউল ক্বারি আমীর উদ্দিন সাহেব যে সুদূর ইংল্যান্ডে বসে বসে আমার গান গুলো খুঁজে খুঁজে দেখতেন তা আমার কোনভাবেই জানা ছিলো না!!

কখনো উনার সাথে কথা হয় নি কোনভাবেই আর দেখা হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না, বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে উনার গান সুরে বেসুরে গাচ্ছে সবই তিনি দেখেন।ব্যাপার টা আমার অজানাই ছিলো। আর থেকেও যেতো যদি কোনদিন উনার সাথে দেখা না হতো।

যাই হোক গত কয়েক মাস আগে থেকেই বাতাসে খবর পাচ্ছিলাম উনি দেশে আসছেন জুলাই মাসে সপরিবারে প্রায় ১৫ বছর পর, কিন্তু উনি আসার খবর শুনে যে হারে বাউল শিল্পী আর উনার ভক্ত বৃন্দের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা দেখতে পাচ্ছিলাম তাতে ভাবিনি আমি আর উনার সামনে কখনো যেতে পারবো।

অবশেষে তিনি এলেন, আসার পর থেকেই রোজ উনার বাড়ির সামনে ১০০/১৫০ মানুষের ভিড় লেগেই থাকতো। আর বৃহস্পতিবার উনার বাড়িতে প্রায় হাজারের উপর মানুষ আসতেন।সবাই উনার ভক্ত। আমি আর যাওয়ার সাহস করিনি, যেখানে সাংবাদিক, কবি, গবেষক, ভক্ত বৃন্দের এত সিডিউল নিয়ে ওইখানে যেতে হয়, তাতে আমি সাধারণ এক মানুষ উনার সামনে যাওয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না।

তাঁর মধ্যে তিনি এলেন একদিন উনার প্রাণের জায়গা, ভালোবাসার জায়গা বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র ভিজিট করতে, আমার কর্মক্ষেত্র হওয়ার সুবাদে সেদিন সরাসরি দেখা পেয়ে গেলাম উনার।কাছে গিয়ে সালাম করলাম, আমার দিকে তাকিয়েই বললেন প্রদীপ মল্লিক ???!!

আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম যার সাথে জীবনে কথা নাই, জীবনে দেখা হয় নি, তাঁর উপর এতো বড় মাপের একজন মানুষ তিনি আমার নাম ধরে ডাকছেন !!! তারপরই বললেন তুমি অনেক ভালো গান করো, আমি ঐ দেশে বসে তুমার গান শুনি!! আমি উনার কথার প্রতিউত্তরে কিছুই বলতে পারিনি…!

তারপর তিনি ঘুরে দেখলেন সিলেট বেতারের সব জায়গা, পরে যাওয়ার সময় গাড়িতে উঠে বসলেন, আমি গাড়ির পেছনে দাঁড়ানো ছিলাম, আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, ডেকে বললেন “প্রদীপ তুমি ভালো গান করছ, আশীর্বাদ রইলো সবসময় তোমার জন্যে” আমি শুধু এইটুকুই বলেছি, “দোয়া করবেন আমার জন্যে”, বললেন, “অবশ্যই সব সময় আছে।”ভাবলাম যাই হোক দেখা তো হলো, আর আমাকে চিনেছেন, আমার নাম ধরে ডেকেছেন এইটাই আমার জন্যে অনেক বড় পাওয়া!

চলে গেলো কিছু দিন, উনিও বাসায় লোকজনের সাথে দেখা করতে করতে ক্লান্ত আর ছবি ওঠা আর সাক্ষাৎকার দিতে দিতে উনার অবস্থা কাহিল, ভাবলাম আর তো দেখা হবেও না।হঠাত একদিন হায়দার রুবেলের ফোন ‘ক্বারি আমীর উদ্দিন সাহেব তাকে বলেছেন প্রদীপ কে বলো আমার এখানে আসতে”!!!

উনার সাথে দেখা করতে সবারই খোনে এতো সিডিউল নিতে হচ্ছে, সেখানে আমার মতো নগন্য মানুষকে নিজে থেকে তলব!!!যাই হোক মনে মনে অনেক খুশি হয়েছিলাম,দিনের বেলা আমি যেতে পারতাম না, সপ্তাহে শুক্রবার আর শনিবারে রাত ৯ টার দিকে আমি যেতাম, গিয়ে যে উনার ধ্যান রুমে বসতাম আর উঠতাম ফজরের নামাজের পরে।

এর মধ্যে তিনি শুরু করলেন আমাকে নিয়ে গানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, সাথে এমন কিছু গান আমাকে তুলে দিতে শুরু করলেন যা আমি আগে কখনোই শুনিনি, উনার ‘আমিরি সংগীত” বই তিনি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন এটা তোমার, এখান থেকে কিছু গান তুলে দিব তোমাকে। শুরু হলো উনার গানের আরো কিছু অজানা বিষয় জানার পর্ব।

আমি নিয়মিত বাউল গান সংগ্রহ করি, কিন্তু বাউল গান যে ত্রিতালে ও আছে তা আমি প্রথম দেখলাম বাউল ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদের গানে!!প্রথম দিনেই ত্রিতালে একটি গান তুলে দিলেন আমাকে।এর পরে উনার বাড়িতে গোবিন্দগঞ্জের আলমপুরের মুর্শিদ মঞ্জিলে আরো কমপক্ষে আমার ৮ দিন যাওয়া হয়েছে।এই ৮ দিনে তিনি আমাকে অপ্রকাশিত কিছু গান তুলে দিয়েছেন প্রকৃত কথা আর সুরে।

একজন বাউল শিল্পী যে গান কে অংকের মতো করে বুঝিয়ে দিতে পারেন তার প্রমাণ পেলাম উনার কাছ থেকে দেখে আর শিখে। আর যন্ত্র সম্পর্কে তাঁর সুর জ্ঞ্যান আর তাল জ্ঞ্যান দেখলে মনে হয় কম্পিউটার দিয়ে উনার কানকে সেট করা হয়েছে যন্ত্র কে সুরে বাধার জন্যে, আর তালের ঘরকে প্রতিটা গানে ঝাপতালে, দাদরা তালে,ত্রিতালে, জলদ কাহারবা তালে, কাহারবা তালে, দ্রুত দাদরা তালে, এমন ভাবে বেধেছেন, যা গানের জ্ঞানহীন মানুষ জীবনেও বুঝতে পারবে না উনি কি গুণী আর জ্ঞানী একজন সঙ্গীত সাধক।

কিছু কিছু গানকে এমন ভাবে সাজিয়েছেন, একেক রাগের উপর ভিত্তি করে সুর করেছেন যা একেকটি রাগপ্রধান গান হিসাবে যে কেউ গাইতে পারবেন, আর এই গান গুলি যে চর্চা করবে তার ক্লাসিক্যাল চর্চা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। আমি উনাকে যতই দেখেছি ততই অবাক হয়েছি, কারণ উনার ধ্যান, জ্ঞ্যান, সবই গান। উনার গানের কথা, সারমর্ম এসব খুজলে অনেক দর্শন সম্পর্কে যে কেউ সহজে জানতে পারবে।

আমি আসলে দুর্ভাগা, তাই উনার সাথে আমি এতো ভালো সুযোগ পেয়েও তেমন সময় কাটাতে পারিনি, তবে যে কদিন একটানা ৭/৮ ঘন্টা করে উনার সাথে সময় কাটিয়েছি এর পুরোটা সময়ই শুধু শিখেছি।উনি গান তুলে দিয়েছেন নিজ হাতে আমাকে, তাই সাহস হয় না সহজে উনার গান করার, কারণ আমি বুঝি গান ভুল গাইলে গানের অমর্যাদা হয়, গানের যিনি জন্ম দিয়েছেন তাঁর অমর্যাদা হয়।তার পর ও চেষ্টা করি মাঝে মাঝে দুঃসাহস করার।

ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদ একজন জীবন্ত কিংবদন্তী, উনার লেখা, উনার গান, উনার দর্শন, সব কিছুই গবেষণা করার মতো বিষয়।কিন্তু উনাকে নিয়ে বাংলাদেশে যে রকমের আলোচনা আর গবেষণা হওয়ার কথা ছিলো তাঁর তিল পরিমাণ ও হয় নি আর হচ্ছে ও না। আমরা আসলে বেঁচে থাকতে মানুষের মূল্যায়ন করতে জানি না, মূলায়ন করি মৃত্যুর পর, যেমন টা হয়েছে সাধক কবি রাধারমণ দত্তের বেলায়, হাছন রাজার বেলায়, বাউল শাহ্‌ আব্দুল করিমের বেলায়, যেমন টা হয়েছে ফকির দুর্বিন শাহ্‌, আরকুম শাহ্‌, শিতালং শাহ্‌, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, বিদিত লাল দাস এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বেলায়। আমাদের এই মন মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া জরুরী
মানুষ কে বেঁচে থাকতে তাঁর প্রকৃত সম্মান টা দিলে জীবিত অবস্থায় মানুষ তাঁর সৃষ্টির, তাঁর কর্মের প্রতিফলন দেখে যেতে পারেন, তাতে আমি মনে করি মৃত্যুর পর ও তাঁর আত্মা তৃপ্ত থাকে।

সবশেষে আমি বাউল সাধক ক্বারি আমীর উদ্দিন আহমেদ সাহেবের দীর্ঘ জীবন কামনা করি, আমি জানি তিনি আরো কিছু কাজ করে যেতে চাচ্ছেন, যা লোকগানের জগতের জন্যে, সুফি জগতের জন্যে বিরাট ভূমিকা পালন করবে।

আমি এতো ছোট মানুষ হয়েও ক্বারি আমীর উদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে নিজের হাতে ধরে গান তুলে নিতে পেরেছি, কিছু নতুন অপ্রকাশিত গান পেয়েছি, সঠিক কথা পেয়েছি, সুর পেয়েছি, এজন্যে আমি আজীবন উনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: