মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
কমলগঞ্জে সংখ্যালঘুর বাড়িতে হামলা: পিইসি পরীক্ষার্থী সহ আহত ৩  » «   নাতির সঙ্গে পিএসপি পরীক্ষা দিচ্ছেন নানি  » «   তবু চলছে সৌদি হামলা; আরো ১২ ইয়েমেনি নিহত  » «   হাইকোর্টের রুল জারি মুক্তি বার্তায় নাম থেকেও, তালিকায় অন্তর্ভুক্তি নয় কেন?  » «   ২০ কোটি টাকায় ‘ভার্জিনিটি’ নিলামে বেচলেন যে মডেল  » «   ওসমানীনগর উপজেলা স্বেচ্চাসেবক দলের মত বিনিময়  » «   ‘সংবিধান অনুসারেই জাতীয় নির্বাচন করতে হবে’  » «   টিকল না ১০ নম্বর সম্পর্কও? সুস্মিতার বয়ফ্রেন্ডের তালিকা…  » «   জাতীয় পতাকা উত্তোলন ছাড়াই চলছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়  » «   বিয়ের রাতে পালালেন সাবিলা নূর!  » «   নিজেকে আরো সুন্দর করে তুলতে ব্যবহার করুন এই ৭ তেল  » «   ‘দু:শাসনের জন্য আ’লীগকে জবাবদিহি করতে হবে’  » «   হাসপাতাল ও হোটেলে র‌্যাবের অভিযান : জরিমানা ২২ লাখ টাকা  » «   জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম ঠেকাতে ইজতেমায় পুলিশের কড়া নজরদারি থাকবে  » «   ঢাকা সেনানিবাসে প্রধানন্ত্রী‘বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করতেই জাতির পিতাকে হত্যা’  » «  

এক সময়ের ধূ-ধূ বালুচরে এখন দুলছে সবুজের ঢেউ



হাতিয়া ও সুবর্ণচর  উপজেলার একশ’ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে যতদূর চোখ যায় ততদূর শুধু সবুজ আর সবুজ। যে চরগুলো এক সময় ছিল শুধুই ধূ ধূ বালুচর, সেসব চরে এখন দুলছে সবুজের ঢেউ। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে এখানকার অধিবাসীরা মাঠে ফলাচ্ছে ফসল। বিভিন্ন শাকসবজি ছাড়াও তারা চাষ করছে মাছ, হাঁস, মুরগি, গরু ও ছাগল।

এখানকার অধিবাসীরা আগে যেখানে বসবাস করতো, সেখানকার চাইতে নতুন ঠিকানায় এসে তারা খুব ভালো আছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও কর্মীদের প্রশিক্ষণের ফলে তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কৃষিকাজ সম্পন্ন করছে। আগে একটি পরিবারের মাসিক আয় ছিল ৩ হাজার ১০৯ টাকা, আর এখন একজন কৃষকের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১১২ টাকা।

কৃষি বেঞ্চমার্ক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সিডিএসপি প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ের আওতাভুক্ত এলাকায় সামগ্রিক ফসল তোলার তীব্রতা ছিল ১২৭ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ১৯১ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ এলাকায় ফসলের তীব্রতা গত ৫ বছর ১৮৪ শতাংশে উঠেছে। আগে প্রতি একর জমিতে দেড় থেকে ২ হেক্টর ফসল উঠলেও বর্তমানে ২ থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

এতে আরো বলা হয়, কৃষক ফোরাম গঠন বর্তমানে কৃষি সেবা সম্প্রসারণের প্রধান পন্থা। গাইডলাইনস ফর পারটিসিপেটরি ফারমার্স ফেডারেশনের আওতায় প্রকল্প এলাকায় ৯০ কৃষক ফোরাম, ৬ কৃষক সমিতি ও একটি কৃষক ফেডারেশন গঠন করা হয়েছে। কৃষকদের বিভিন্ন সংগঠনে নারীর অনুপাত প্রায় ৪২ ভাগ।
এ প্রকল্পে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কৃষকদের দক্ষ করে তুলতে বেশ কিছু লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে- একদিনের প্রশিক্ষণ ১ হাজার ১০০টি, চার দিনব্যপী প্রশিক্ষণ ৯৫টি, মোটিভেশনাল ট্যুর ৭২, প্রদর্শনী ১ হাজার ৮০টি, মাঠ দিবস উদযাপন ৮৪টি, অভিযোজন ট্রায়াল ৮টি। ফলন কর্মক্ষমতার জন্য মৌসুমি ওয়ার্কশপ ১২টি, ভ্যালু চেইন ওয়ার্কশপ ৬টি, মৌসুমি প্রতিবেদন ৪৮টি, বার্ষিক প্রতিবেদন ৩টি, জরিপ ও পরিবীক্ষণ ৭টি।

এখানকার কৃষকদের যেসব উপকরণ ও সরঞ্জাম সহায়তা দেয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- হাত স্প্রেয়ার ১৪০, পদচালিত মাড়াই যন্ত্র ১৮০, প্লাস্টিকের ড্রাম ১ হাজার ৫০০, পোকা ধরা ফাঁদ ৩ হাজার ৯১০টি, ইউরিয়া ছাড়া অন্য সার ১৪৯ মেট্রিক টন ও উচ্চ ফলনশীল বীজ ৩৬ মেট্রিক টন।

প্রকল্প এলাকায় বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, কেঁচো কমপোস্ট সার, আইপিএম প্রযুক্তি, লবণাক্ত সহিষ্ণু, খরা সহনশীল, জলমগ্নতা সহিষ্ণু জিঙ্ক সমৃদ্ধ চাল উৎপাদনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে।

ফসলের ফলন কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন: উচ্চ ফলনশীল আউশ ধান হেক্টর প্রতি ৩ দশমিক ২ টন থেকে ৩ দশমিক ৯ টন পর্যন্ত, উচ্চ ফলনশীল আমন ধান হেক্টর প্রতি ৪ টন থেকে ৫ দশমিক ২ টন পর্যন্ত, হাইব্রিড ৪ দশমিক ৫ টন থেকে ৬ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত, বোরো হাইব্রিড ৬ টন থেকে ৭ দশমিক ৩ টন পর্যন্ত ফলন হচ্ছে। সবজির মধ্যে শসা, করলা, দেশি শিম, টমেটো, বাঁধাকপি হেক্টর প্রতি ১০ টন থেকে ৩০ টন পর্যন্ত। আলু ৩০ থেকে ৩৫ টন, তরমুজ ২০ থেকে ৩০ টন পর্যন্ত ফলছে।
চর ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্টের (সিডিএসপি-৪) ল্যান্ড সেটেলমেন্ট অ্যাডভাইজার মো. রেজাউল করিমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে কৃষকরা সনাতন পদ্ধতিতে স্থানীয় জাতের বীজের মাধ্যমে ধান চাষ করতেন। এর ফলে ধানের ফলন ছিল হেক্টর প্রতি ১ দশমিক ৫ টন থেকে ১ দশমিক ৮ টন পর্যন্ত। পরবর্তীতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করায় উৎপাদন হেক্টর প্রতি ৩ দশমিক ৫ টন থেকে ৭ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত বেড়েছে। এ সময় মোট ধান উৎপাদন ৩১ হাজার ৭৯ টন থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৪৯০ টনে। ৪ হাজার ৪০০ টন থেকে বেড়ে সবজির উৎপাদন দাঁড়ায় ১০ হাজার টনে। এছাড়া তরমুজ, ডাল, তৈলবীজসহ অন্য ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে উল্লেখ করার মতো।

প্রকল্পের উপকারভোগী কৃষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকগুণ বেশি ফলন পাওয়ায় নিজেদের চাহিদা পূরণ করে এখন খুচরা ও পাইকারি বাজারে সবজি ও ফল বিক্রি করতে পারছেন।

সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বরে এখানে ১২ হাজার ৪১৭ মেট্টিক টন সবজি বিক্রি হয়েছে। এসব সবজি পার্শ্ববর্তী বাজারসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় পাঠানো হয় । এর মধ্যে দেশি শিম বীজ ২ হাজার ৪০৯ টন, দেশি শিম ৯৬১ টন, শসা ৪ হাজার ৬৬৪ টন, করলা ১ হাজার ৬১৯ টন, মিষ্টি লাউ ১১৬ টন, গজ দীর্ঘ শিম ৬৩৩ টন, টমেটো ১০৪ টন, চিচিঙ্গা ৩৫৭ টন, লাউ ২৯৮ টন, অকরা ২ হাজার ১৭১ টন, কাঁচা মরিচ ৮৫ টন।

এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে নারী কৃষকরা উদ্ভিদ নার্সারির মাধ্যমে আয় বাড়িয়েছেন। এর মুনাফা তারা ধান মাড়াই, পোল্ট্রি ফার্ম স্থাপন, নসিমন পরিচালনাসহ বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক কাজে বিনিয়োগ করেছেন।
এখানকার কৃষকদের আর্থিক সেবা দিতে ডিএই কর্তৃক একটি সংগঠন করা হয়। এই সংগঠনে ২৬ হাজার ৩শ ৭৩ জনকে সদস্য হিসেবে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে ১৪ হাজার ৮৯৬ জনকে ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়। এসব ঋণের শতভাগ আদায় হয়েছে। কেউ খেলাপি নয়। সদস্যদের মোট সঞ্চয় রয়েছে ৮ কোটি ৪০ লাখ।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, এখানকার অধিবাসীরা নিজেদের স্বচ্ছলতা ফেরাতে বাড়ির পাশেই পুকুর তৈরি করে মাছ চাষ করছে। পুকুরের পাড়ে ও আশপাশে প্রচুর পরিমাণে শীতকালীন শাকসবজিও ফলাচ্ছে। জানা গেছে, প্রতিদিন সকালে সেখানকার নিদিষ্ট স্থানে দূর দূরান্ত থেকে পাইকাররা ট্রাক নিয়ে হাজির হচ্ছে।

চাষীরা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে নগদ দামে সবজি ও অন্যান্য ফসল বিক্রি করতে পেরে খুব খুশি। প্রায় ৬টি এনজিও এখানকার চাষীদের জন্য কাজ করছে। কৃষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ছাড়াও নানা প্রকার কৃষি উপকরণ দিয়ে তারা কৃষকদের সহযোগিতা করছে। ফসল চাষ ছাড়াও এখানকার মানুষ নদী ও খাল থেকে মাছ ধরে তা বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

 

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: