মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
রাতে দেশ ছাড়ছেন মাহমুদউল্লাহ-মুস্তাফিজ  » «   পারিবারিক অশান্তির মূলে পরকীয়া  » «   ‘এই সুমি সেই সুমি’  » «   সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ প্রিয়া প্রকাশ  » «   খালেদার শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার বিষয়ে যা বললেন আ’লীগ নেতারা  » «   পাবনায় সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে বই পড়া ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত  » «   পাবনা জেলা বিড়ি শিল্প মালিক সমিতির কমিটি গঠন শাহাদত সভাপতি রাসেল সম্পাদক  » «   কানাডায় বাংলাদেশি তরুণীর কৃতিত্ব  » «   মাথা না ধুলে ফরজ গোসল হবে?  » «   হোটেলে রুম ফাঁকা নেই, ফিরিয়ে দেয়া হলো মোদিকে  » «   ‘বর্তমান অবস্থায় খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন না’  » «   হবিগঞ্জে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি,আহত ৩০  » «   পোশাক নিয়ে আলোচনায় সোহানা সাবা  » «   ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত শহীদ মিনার  » «   চুনারুঘাটে অগ্নিকান্ডে ২টি দোকান পুড়ে ছাই  » «  

আমাকে আরেকজন বাদল মিয়া এনে দাও



আমাকে আরেকজন বাদল মিয়া এনে দাও

কারো মৃত্যুর খবরে মন প্রসন্ন হওয়ার কথা নয়। আর সে যদি হয় ট্রেনে কাটা পড়ার মত নৃশংস। তাহলে তো, যে কোন সুস্থ মনেরই ভারাক্রান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বাদল মিয়ার মৃত্যুর খবরে আমার কেন জানি তা হয়নি। শত চেষ্টা করেও মন খারাপ করতে পারিনি।

এই ভাবনার প্রথমেই যেটা মাথায় এসেছে, সেটা হচ্ছে, আমিই হয়তো স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারছি না। সেটা যে হতে পারে না তা নয়।কারণ আমাদের সকাল থেকে গভীর রাত মানুষ ঠকানোর যে চেইন অব কমান্ড, সেখানে একজন মানুষ একটি শিশুকে ট্রেনে কাটা পড়তে দেখবে, দু’বার আহা বলবে এবং কিছুক্ষণ পর ভুলে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। তখন আর সবার মত আমিও খবর শুনে ওই শিশুটির জন্যেও একটু মন খারাপ করতাম।

অভ্যস্ততার একটা ব্যাপার তো আছে। আমাদের শোনা অভ্যেস, মা ও তিন কন্যাকে ঘরের মধ্যে আটকে আগুন ধরিয়ে দেয়ার গল্প। আমাদের শোনা অভ্যেস রাতের আঁধারে ছয়শ শিশুর স্কুলে আগুন দেয়ার গল্প। শিশুর পায়ু পথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার গল্প।কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ট্রেন লাইনে কেউ একজন ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং নিজের জীবনের বিনিময়ে শিশুটিকে উদ্ধার করবে! এরকম খবর মাথায় যদি ধাক্কা দেয় এবং মাথা ওলট পালট করে দেয় তাতে অবাক হওয়ার কী কিছু আছে ?

এর পরপরই চিন্তা করি, এই বাদল মিয়ার মৃত্যু তো কোন সাধারণ মৃত্যু নয়। তাহলে কেন সাধারণ মৃত্যুর মত মন খারাপ করবো? এই অসাধারণ মৃত্যু আমার মত দুর্বল মানুষকে বার বার বার্তা দিচ্ছে। “হতাশ হয়ো না, বাদলরা তোমার আশে পাশেই আছে, যে কোন বিপদে শেষ মুহূর্তে নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে রক্ষা করবে” ।

মৃত্যু নিয়ে সেই আপ্ত বাক্যটি আবারো বলতে ইচ্ছে করে। “কোন কোন মৃত্যু বালি হাঁসের পালকের মত হালকা, আবার কোন কোন মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারি” গুরুত্বের দিক দিয়ে বাদল মিয়ার মৃত্যু আমার কাছে থাই পাহাড়ের মত ভারি। এই মৃত্যু চট করে ভুলে যাবার নয়।

প্রায় প্রতিটি মানুষ যেখানে নিজে ভাল থাকার বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখানে বাদল মিয়া নামে একটি নতুন বাঁক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন চাইলেই এই বাঁকে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে পারে। প্রশ্ন করতে পারে নিজেকে, আজ যে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সে আছে সেটা কী চালাবে? না থামাবে?

খুব সাধারণ রেল কর্মচারী বাদল মিয়া আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলেন, কোন মানুষই সাধারণ নন।আপাতত দৃষ্টিতে যে শ্রেণি বিভাজন আমরা করি, তা ঠিক নয়। প্রত্যেকেরই অসাধারণ হওয়ার ক্ষমতা আছে।আর সেই অসাধারণ হওয়ার জন্যে তথাকথিত সামাজিক অবস্থানের দরকার নেই। যিনি যেখানে আছেন সেখান থেকেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

বাদল মিয়াকে নিয়ে এত কথা বলছি দেখে, অনেকে হয়তো মুচকি হাসছেন।মনে মনে বলছেন, এরকম কত দেখলাম। প্রথম দু’একদিন পত্র পত্রিকায় লেখা হয়, তার পর সবাই ভুলে যায়। খুব ঠিক। আমরা বাদল মিয়াদের খুব সহজেই ভুলে যাই।

বছর দুই তিনেক আগে মিরপুরে হযরত আলী নামে একজন দোকান কর্মচারী মারা গিয়েছিলেন ছিনতাইকারীদের হাতে। তিনি দুই নারীকে ছিনতাই থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন।আমি যতদূর জানি সেই হত্যাকারীরা ধরা পড়েনি। হযরত আলীর পরিবারের কী হয়েছে তাও জানতে পারিনি।তাঁর দু’টো সন্তান ছিল, পত্রিকায় পড়েছিলাম। হযরত আলীর কথা অনেকে জানেনও না। দু’একটি গণমাধ্যমে খুব সামান্য এসেছিল ।

একই ভাবে হারিয়ে যাবেন আজকের বাদল মিয়া।এটাই আমাদের জাতিগত ধারাবাহিকতা। শুধু বাদল মিয়ার আট সন্তান বুঝতে পারবেন মাথার ওপর অভিভাবক না থাকার দুর্ভোগ কাকে বলে। এখন বাদল মিয়ার পরিবারের কষ্ট, মানুষ দূর থেকে দেখবে আর বলবে, ব্যাটা একটা বোকা ছিল। শুধু শুধু জানটা দিল। তারাই অন্যদের উৎসাহ দেবে, আর যেন কেউ এমন বোকামি না করে।
কিন্তু মানুষ বাঁচাতে যে হযরত আলী আর বাদল মিয়ার মত বোকাদের খুব দরকার। কেননা তাঁরা জীবন দিয়ে শুধু জীবনই রক্ষা করেন না। রক্ষা করার চেষ্টা করেন গোটা জাতিকে। তাঁরা জাতিকে অনুকরণীয় মানুষ চেনার সুযোগ করে দেন। এরাই আসলে দেশ প্রেমের মাপকাঠি।তাদের ত্যাগের গল্প বাঁচিয়ে রাখা দরকার।দরকার ত্যাগী মানুষটিকে সম্মান দেয়ার।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
palash_ahasan2003@yahoo.com

 

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: