বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
লন্ডনে দ্বিতীয় জনপ্রিয় ভাষা বাংলা  » «   ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে সাব-রেজিস্ট্রার আটক  » «   আর কোনো হায়েনার দল বাংলার বুকে চেপে বসতে পারবে না  » «   সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী  » «   ফের জাতীয় পার্টির ঢাকা জেলা শাখার সভাপতি সালমা ইসলাম এমপি  » «   বিয়ানীবাজারে ৯৯০ পিস ইয়াবাসহ পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী আটক  » «   আয়কর দিবস উপলক্ষে সিলেটে বর্ণাঢ্য র‌্যালি  » «   এবার শ্রীমঙ্গলে ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন  » «   বেলজিয়ামে মসজিদে তালা দেওয়ায় বাংলাদেশিদের প্রতিবাদ  » «   পায়রা উড়িয়ে জাতীয় পার্টির ঢাকা জেলা শাখার সম্মেলন উদ্বোধন  » «   ভারতের অর্থনীতির দুরবস্থা, জিডিপি কমে সাড়ে ৪ শতাংশ  » «   পায়রা উড়িয়ে সম্মেলন উদ্বোধন করলেন শেখ হাসিনা  » «   লন্ডন ব্রিজে আবারও সন্ত্রাসী হামলা, নিহত ২  » «   চীন থেকে মা-বাবার জন্য পেঁয়াজ নিয়ে এলেন মেয়ে  » «   রক্তে ভাসছে ইরাক, নিহত ৮২  » «  

আজ পহেলা অগ্রহায়ণ: নানা আয়োজনে চলছে ‘নবান্ন উৎসব’



নিউজ ডেস্ক:: আজ শনিবার (১৬ নভেম্বর), পহেলা অগ্রহায়ণ। বাংলাদেশ প্রবর্তিত নতুন পঞ্জিকা মতে, নবান্ন উৎসবের শুরুর দিন। চিরায়ত বাংলায় শস্য উৎপাদনের নানা পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন তার একটি। কৃষি প্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই নবান্ন উৎসব পালন হয়ে আসছে।

গোবরে লেপা ঝকঝকে উঠোন। সেখানে রাখা পাকা ধান। একদিকে চলছে মাড়াই, অন্যদিকে হাঁড়িতে সিদ্ধ হচ্ছে ধান। সেই ধান আবার রোদে শুকানোও হচ্ছে-এ রকম দৃশ্য এখন গ্রামবাংলায় সর্বত্রই। আর এই দৃশ্য বলে দেয় ফসল তোলার আনন্দের এক উৎসবের কথা। সেই উৎসব হলো নবান্ন। যদিও কিছুদিন আগে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতের ক্ষত এখনও রয়ে গেছে কোনও কোনও অঞ্চলে। তারপরেও অবশিষ্ট সোনালী ফসল নিয়ে আশা বুক বাঁধছেন এদেশের প্রাণপ্রিয় কৃষান-কৃষানি।

বাংলাদেশের নবান্ন উৎসব পালন করত প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়। হেমন্তে আমন ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ কিংবা পৌষ মাসে গৃহস্থরা এ উৎসব পালনে মেতে উঠতেন। উৎসবের প্রধান অঙ্গ ছিল নতুন চালে পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ করা। পরে দেবতা, অগ্নি, কাক, ব্রাহ্মণ ও আত্মীয়-স্বজনদের নিবেদন করে গৃহকর্তা ও তার পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করতেন। এ উপলক্ষে বাড়ির প্রাঙ্গণে আলপনা আঁকা হতো। পিঠা-পায়েসের আদান-প্রদান এবং আত্মীয়-স্বজনের আগমনে পল্লীর প্রতিটি গৃহের পরিবেশ হয়ে উঠত মধুময়। সর্বত্র গুঁড়ি কোটার কাহিলের (হাত দিয়ে ভাঙানো এক ধরনের কাঠের পাত্র), শাঁখের শব্দ ইত্যাদিতে গ্রামাঞ্চল হয়ে উঠত প্রাণবন্ত। পাড়ায়-পাড়ায়, বাড়িতে-বাড়িতে বসত কীর্তন, পালাগান ও জারিগানের আসর।

বাংলাপিডিয়ায় প্রকাশিত মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরির লেখা থেকে জানা যায়, ‘‘অগ্রহায়ণ মাসের উত্থান একাদশীতে মুখোশধারী বিভিন্ন দল রাতভর বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাচগান করত। কৃষকরা নতুন ধান বিক্রি করে নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ কিনত। তবে রীতি নেই। এখন সংক্ষিপ্তভাবে কেউ কেউ এ উৎসব পালন করে।’’

বুলবুলের ক্ষত ভুলে ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবে মেতে উঠবে গ্রামীণ জনপদ এবারও। এখন শহরেও আয়োজন করা হয় এই উৎসব। তাতে গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গে শহুরে জীবনের একটি সংযোগ ঘটে। অসাম্প্রদায়িক উৎসবে প্রাণের টানে যোগ দেয় মানুষ। নিজের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে নতুন প্রজন্মের।

এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক লোকবিদ শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘‘বাঙালির অন্যান্য উৎসবের মতো ‘নবান্ন’ জাতীয় উৎসব এটি। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এদেশের প্রান্তিক নাগরিকরা বেশ ঘটা করে নবান্ন উৎসব পালন করতেন। এখনও করেন তবে সীমিত আকারে। নানা কারণে এই উৎসব ঢামাঢোলে পালিত হয় না। তবে মনে রাখতে হবে প্রাচীন ঐহিত্য ধরে রাখতে হলে এই ধরনের উৎসব জারি রাখতে হবে।’’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘আমরা আগেরকার দিনগুলোতে এ উৎসবের জন্য মুখিয়ে থাকতাম। নতুন ধানের গন্ধে মৌ মৌ করতো উঠোন-ঘর-বাড়ি।দল বেঁধে আমরা এবাড়ি ওবাড়ি নতুন পিঠা-পায়েস খেয়ে ঘুর-ফিরতাম। সন্ধ্যার পর থেকে উঠোনজুড়ে চলতো জারি সারি গানের আসর। এখন এ উৎসব বিরল হলেও বিলুপ্ত হয়ে যায় নি।বাঙালির অন্যতম এই অনুষঙ্গটি ধরে রাখতে হবে।’’

নবান্ন শব্দটির গঠন প্রণালী এ রকম, নব + অন্ন = নবান্ন। অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধানের চালের ভাত ও নানা রকম ব্যঞ্জন সহযোগে যে খাদ্য-দ্রব্য পরিবেশন করা হয় তা-ই নবান্ন। এটি একটি শস্যভিত্তিক লোক উৎসব। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ঐতিহ্যবাহী এবং মাটির সঙ্গে চিরবন্ধনযুক্ত উৎসব এ নবান্ন।

এরই মধ্যে সোনার ফসলে ভরে উঠেছে কৃষকের জমি। হেমন্তের মৃদু-মন্দ বাতাসে দারুণ খেলা করছে ধানের শীষ। কৃষকের হাড়-ভাঙা খাটুনির পর এরা মাথা উঁচু করে যেন জয়ধ্বনি করছে। মাঠের দিকে তাকিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন বুনছে কৃষক। ধান কাটার কাজও শুরু হয়ে গেছে। চলবে মাসের বাকি দিনগুলো। শীত আসার আগেই নতুন ধান ঘরে তোলার পর আয়োজন করা হবে নবান্ন উৎসবের। যদিও কিছুদিন আগে বুলবুলে আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপক ধানক্ষেত। তারপরেও যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, তাই নিয়ে আশায় স্বপ্ন বুনছেন কৃষক।

গোয়ালভরা গরু না থাকলেও অনেক কৃষকের ঘরে আজও গোলাভরা ধান থাকে। তাই ধান কাটা ও তা মাড়াই নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করবেন কৃষাণ-কৃষাণীরা এই মাসজুড়ে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই দিনটিকে বরণ করেছেন- ‘নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা’ বলে।

আমন ধান ঘরে তোলার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় এ উৎসবের ধুমধাম। বাড়ি বাড়ি তৈরি হয় নানা মুখরোচক পিঠা-পুলি আর পায়েস। খাওয়া হয় নানা রকম পিঠা পায়েস, যেমন- দুধপুলি, তিলপুলি, নারকেলপুলি, দুধের পিঠা, তেলের পিঠা, হাতের তৈরি সেমাই পিঠা, ভাঁপা পিঠা, চিতই পিঠা, মুঠি পিঠা, পাটি সাপটা ইত্যাদি।

শীতের আগমন এই মাস থেকে। শিশিরসিক্ত ঘাস ও লতাপাতা আমন ক্ষেতে ধানের গাছের পাতায় শিশির বিন্দু মুক্তোর দানা সেই বার্তা বহন করে। হেমন্তের বিকেলে কিষান ধান কেটে এনে আঁটি বেঁধে আঙ্গিনায় রাখার পর ক্লান্ত হয়ে যায়। গাঁয়ের কিষান বধূ পিঁড়ি পেতে বসতে দিয়ে গামছা এনে দেয়। সন্ধ্যার পর হেমন্তের স্নিগ্ধ রাতে কিষাণ-কিষানী আঙ্গিনায় বসে আকাশে মায়াবি চাঁদের সঙ্গে প্রকৃতির এমন রূপের মধুময়তায় গা ভাসিয়ে দেয়।

হেমন্তের এমন রূপে জীবনানন্দ দাশের কবিতার চরণ মনে করে দেয়- ‘আবার আসিব ফিরে,/ ধানসিড়িটির তীরে-এই বাংলায়,/ কার্তিকের নবান্নের দেশে,/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এই কাঁঠাল ছায়ায়…।’

হেমন্তের বিকেলে হিমেল ঝিরিঝিরি বাতাসে খেজুর গাছের তলায় গাছিরা দাঁড়ায়। খেজুর গাছ পরখ করে রস-আহরণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। বিশেষ কায়দায় কোমরে রশি বেঁধে খেজুর গাছের ওপরে উঠে ধারাল কাঁচি দিয়ে চেঁচে-ছিলে বাদামি রঙের ‘কপালি’ বের করে রাখে। সময় হলেই এই জায়গায় বাঁশের কঞ্চি ঢুকিয়ে ছিদ্র করে দেয়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘নলি’।

প্রতিদিন বিকেলে গাছের মাথায় ঠিলা বা কলস বেঁধে রাখেন গাছিরা। রাতভর কপালিতে আসা রস নলি দিয়ে চুইয়ে ঠিলায় পড়ে ভরে যায়। এই রস দিয়েই বানানো হয় গুড়। শীতের বিহানবেলায় মুড়ির সঙ্গে এই রস পান করার স্বাদই আলাদা। একদিকে নতুন ধানের আতপ চাল, অন্যদিকে খেজুরের রস। এই দুয়ের ব্যঞ্জনে তৈরি হয় মুখরোচক যে পায়েস, তা এখনও ঐতিহ্য হিসাবে টিকে আছে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে।

পাহাড়েও বহু বছর ধরে হয়ে আসছে নবান্ন উৎসব। নাম ভিন্ন হলেও উৎসবের ধরন প্রায় একই। সাঁওতালরা পৌষ-মাঘ মাসে শীতকালীন প্রধান ফসল ঘরে তুলে উদযাপন করে ‘সোহরায়’ উৎসব। তারা সাতদিন সাতরাত গানবাজনা এবং মদ্যপানের মাধ্যমে এ উৎসব পালন করে। উসুই উপজাতি অন্নদাত্রী লক্ষ্মীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ‘মাইলুকমা’ উৎসব পালন করে। জুম চাষি ম্রো উপজাতি ‘চামোইনাত’ উৎসবে মুরগি বলি দিয়ে নতুন ধানের ভাতে সবাইকে ভূরিভোজন করায়। ফসল তোলার পর গারো উপজাতি ফল ও ফসলের প্রাচুর্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে পালন করে পানাহার ও নৃত্যগীতবহুল ওয়ানগালা উৎসব। উৎসবেও থাকে নাচ-গান, পানাহারসহ নানা আয়োজন।

উত্তর-পশ্চিম ভারতের ওয়াজিরাবাদে নবান্ন উৎসব পালিত হয় বৈশাখ মাসে। সেখানে রবিশস্য গম ঘরে তোলার আনন্দে এ বৈশাখী নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। দক্ষিণ ভারতেও প্রচলিত আছে এমনি ধরনের নবান্ন উৎসব।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: