শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ  » «   কমতে শুরু করেছে চালের দাম  » «   কনডমের বিজ্ঞাপনে সানি লিওন, চটেছেন ভারতীয়রা  » «   সাতক্ষীরায় ১৩ রোহিঙ্গা উদ্ধার করেছে পুলিশ  » «   পরিচালক এফআই মানিকের পাশে দাঁড়ালেন অনন্ত জলিল  » «   ‘মেসির কারণেই নেইমার বার্সা ছেড়েছেন’  » «   রিয়াল মাদ্রিদে যাচ্ছেন কাভানি!  » «   কাশিমপুরে পাঁচ কারারক্ষী বরখাস্ত  » «   নাটোর থেকে তিন’শ মণ পাট বোঝাই ট্রাক উধাও  » «   সাপাহারে কারিতাসের ভেলিডেশন এট ওয়ার্ড লেভেল অনুষ্ঠিত  » «   ঢামেক হাসপাতাল‘সরকারী কাজ এমনই হয়!’  » «   সাপাহারে বিদ্যুৎস্পৃৃষ্টে রাজমিস্ত্রী নিহত!  » «   যে নয়টি কারণে প্রতিদিন খেতে পারেন দই  » «   লড়াই করতে চান রোহিঙ্গারা  » «   সীতাকুণ্ডে মাইক্রোবাস চাপায় নিহত ১  » «  

আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন



নিজস্ব প্রতিবেদক ::‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ মেতে ওঠার দিন আজ। আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মজয়ন্তী। ‘মম এক হাতে বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’ নিয়ে যে কবি ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি আবার বললেন, ‘আমি চিরতরে দূরে সরে যাবো/তবু আমারে দেব না ভুলিতে।’ এমন আস্থাপূর্ণ উচ্চারণ বাংলার আর কোনো কবির মুখে শোনা যায়নি। ক্ষণজন্মা এই কবির জন্মদিনটি উদযাপনে সরকারি উদযাপন কমিটি, নজরুল ইন্সটিটিউট ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এ ছাড়া সিলেটে নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে সিলেট নজরুল পরিষদ। কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে আজ বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী জন্মোৎসব উদযাপনের আয়োজন থাকছে। দিনব্যাপী আয়োজনে থাকছে কবির প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, দলীয় পরিবেশনা, আলোচনা, নৃত্যালেখ্য-আজি নৃত্যছন্দে কুসুম চয়নে ও একক সংগীত পরিবেশনা। একক পরিবেশনায় থাকবেন ভারতের কলকাতা থেকে আগত শিল্পি তানিয়া পাল ও সিলেটের হিমাংশু বিশ্বাস।
বাংলা সাহিত্যের কাব্যভুবনে ধূমকেতুর মতো যার আবির্ভাব ঘটেছিল, যার দীপ্ত ছটায় উদ্ভাসিত হয়েছিল বাঙালি জাতির মন ও মনন। তিনি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে, দরিদ্রতার বিরুদ্ধে ও ধর্মীয় কূপমন্ডূকতার বিরুদ্ধে আজন্ম লড়াই-সংগ্রাম করে জাতিকে দিয়ে গেছেন অনেক কিছু। কিন্তু দীর্ঘদিন নির্বাক থেকে, উপেক্ষিত থেকে, আপন ভুবনে এক রাশ ক্ষোভ নিয়ে একাকী নিঃসঙ্গ বিচরণ করে ফিরে গেছেন রিক্ত হাতে।
বাংলা সাহিত্যে সাম্য, সংগ্রাম ও বিদ্রোহের কবি, বিরহ ও প্রেমের কবি জাতীয় নবজাগরণের দিশারি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুলের বিদ্রোহ ছিল শোষণ-নির্যাতন, জুলুম-অত্যাচার, বিভেদ-বৈষম্য, অসত্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে। তাই তো তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন তার কবিতা, গান, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস, চলচ্চিত্র ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে। শিশু বয়স থেকেই কঠিন জীবন সংগ্রামের বাস্তব উপলব্ধি আর পরাধীনতার গ্লানি নজরুলের মনমানসিকতায় যে তীক্ষè প্রভাব ফেলেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বাকরুদ্ধ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি মাথা উঁচু করে সগর্বে দাঁড়িয়ে জানান দিয়েছেন নিজেকে। এতকিছুর পরও কবির সব সৃষ্টির মূলে ছিল ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই- নহে কিছু মহীয়ান’ এই আদর্শ।
নজরুলের জীবনচেতনায় ‘সবার উপরে মানুষ সত্য-তাহার উপরে নাই’ এ অমিয় বাণী স্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। তার আবির্ভাবকালে এ দেশের সমাজমানস একটা সমূহ উত্তরণের জন্য উদগ্রীব হয়েছিল, যা নানাভাবে অসহযোগসহ এই উপমহাদেশে স্বাধিকার অর্জনের নানা আন্দোলন কর্মসূচির রূপ পরিগ্রহ করে। তিনিই প্রথম বাঙালি কবি যিনি পূর্ণাঙ্গভাবে ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা ও চেতনায় বলিষ্ঠতা প্রকাশিত হয়েছে সর্বত্র। বিশের দশকে ২০ বছরের যুবকের মনের ভেতরকার সেই যে বিদ্রোহ, শোষণ, বঞ্চনা, পরাধীনতা, গ্লানি, ক্ষোভ, দ্রোহ তারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছিল ‘বিদ্রাহী’ কবিতায়, যা তখনকার ক্ষুব্ধ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে প্রজ্বলিত মশাল হিসেবে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। পরবর্তীকালে স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা হিসেবে দেখা দেয়।
কবি ৭৭ বছরের জীবনকালের ৩৪ বছরই ছিলেন নির্বাক (১৯৪২-১৯৭৬)। বেঁচে থাকার জীবন সংগ্রাম, অভাব-অনটন, নানা প্রতিকূলতা, জেলজুলুম ও হুলিয়ার মধ্যেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সময় ছিল মাত্র ২৪ বছর (১৯১৯-১৯৪২)। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী নজরুল এই ২৪ বছরে সৃষ্টি করে গেছেন ২২টি কাব্যগ্রন্থ, সাড়ে ৩ হাজার, মতান্তরে ৭ হাজার গানসহ ১৪টি সংগীত গ্রন্থ, ৩টি কাব্যানুবাদ ও ৩টি উপন্যাস গ্রন্থ, ৩টি নাটক, ৩টি গল্পগ্রন্থ, ৫টি প্রবন্ধ, ২টি কিশোর নাটিকা, ২টি কিশোর কাব্য, ৭টি চলচ্চিত্র কাহিনীসহ অসংখ্য কালজয়ী রচনা। তাই তো একাধারে তিনি কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, শিশু সাহিত্যিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার, স্বরলিপিকার, গীতিনাট্যকার, গীতালেখ্য রচয়িতা, চলচ্চিত্র কাহিনিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, সংগীত পরিচালক, গায়ক, বাদক, সংগীতজ্ঞ, অভিনেতাসহ আরও কত কি।
কবি নজরুলের জন্ম বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ইংরেজি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে। তাঁর পিতা কাজী ফরিদ উদ্দিন ও মা জাহেদা খাতুন। বাল্যকালে নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। জীবনভর মানুষের দুঃখ-কষ্ট, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লেখনীর মাধ্যমে লড়াই করে গেছেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সইতে হয়েছে তাকে। সেই শিশু বয়সেই তাকে নামতে হয় কঠিন জীবনসংগ্রামে।
বাংলা সাহিত্যে যখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব সর্বগ্রাসী, ঠিক তখনই নজরুল সেই প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে স্বাতন্ত্র্য ধারার সূচনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন সঞ্জীবনী গতির সৃষ্টি করেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী কবি তাঁর সমগ্র লেখনীর মধ্যেই ‘সবার উপরে মানুষ সত্য- তাহার উপরে নাই’ এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ১৯৪১ সালের শেষের দিকে কবি যখন নন্দিনী চলচ্চিত্রের সংগীত রচনা ও সুরারোপ নিয়ে ব্যস্ত তখন হঠাৎ তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। লুম্বিনী পার্ক ও রাচি মেন্টাল হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে এক বছরেরও বেশি সময়। ১৯৫৩ সালে কবিকে পাঠানো হয় ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে। কিন্তু ততদিনে সবই শেষ। বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। সেই ১৯৫৩ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত নির্বাক ও অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় অনেকটা অনাদরে নীরবে-নিভৃতেই কাটে অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভার অধিকারী বিদ্রোহী নজরুলের জীবন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবির জন্মদিনে নির্বাক কবিকে ঢাকায় নিয়ে এসে তাকে জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। তার কবিতা ‘চল্ চল্ চল্- ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল-’কে তিনি সামরিক সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করে কবিকে সম্মানিত করেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে চিকিৎসারত অবস্থায় কবি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির সেই হৃদয় নিংড়ানো আকুতি ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ গানের সূত্র ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে কবর দেয়া হয়।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার বস্তুনিষ্ট মতামত প্রকাশ করুন

টি মন্তব্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

Developed by: